বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও কোনো বিদেশি নাগরিকের ভারতে প্রবেশের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হয় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন দিল্লি হাইকোর্ট। জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, জনস্বাস্থ্য, জনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মতো বিষয় বিবেচনায় অভিবাসন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে বৈধ কাগজপত্র থাকা বিদেশিকেও প্রবেশে বাধা দিতে পারে।
তুর্কমেনিস্তানের এক নারীর করা মামলার শুনানিতে এমন মন্তব্য করেন দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি অমিত মহাজন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দেওয়া আদেশের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ওই নারী বৈধ ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে ভারতে পৌঁছান। তবে বিমানবন্দরে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠায়। একই সময়ে তার সঙ্গে থাকা স্বামীকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
এরপর ভারতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার কারণ লিখিতভাবে জানানো এবং বৈধ ব্যবসায়িক ভিসার ভিত্তিতে তাকে দেশে ঢোকার অনুমতি দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন ওই নারী।
শুনানিতে আদালত স্পষ্ট করে বলেন, ভিসা ইস্যু হওয়া আর কোনো বিদেশি নাগরিককে ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া—দুটি পৃথক বিষয়। বৈধ ভিসা থাকলেই ভারতে প্রবেশের কোনো নিঃশর্ত বা আইনগতভাবে নিশ্চিত অধিকার সৃষ্টি হয় না।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভিসা প্রদান, প্রবেশের অনুমোদন এবং অভিবাসন ছাড়পত্র দেওয়া রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার আওতাভুক্ত। জাতীয় নিরাপত্তা, দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা, অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিষয় বিবেচনা করেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
সরকারের পক্ষের আইনজীবীও আদালতে যুক্তি দেন, বৈধ ভিসা থাকার অর্থ এই নয় যে কোনো বিদেশি নাগরিক ভারতে প্রবেশের অখণ্ডনীয় অধিকার অর্জন করেছেন। ভিসা দেওয়া এবং সীমান্তে প্রবেশের অনুমতি—দুই প্রক্রিয়া আলাদা। বিদেশি নাগরিকের প্রবেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অভিবাসন আইন ও কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারাধীন।
কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানায়, ওই নারীর বিষয়ে কিছু নেতিবাচক তথ্য পাওয়া যাওয়ার পর তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
তার আগের ভারত সফরের সংখ্যাও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। আদালতে জানানো হয়, ২০২৫ সালে ওই নারী মোট ৪৭ বার ভারতে ভ্রমণ করেন। অধিকাংশ সফরের সময়কাল ছিল মাত্র এক থেকে তিন দিন। এসব ভ্রমণে তিনি ব্যবসায়িক ও চিকিৎসা—উভয় ধরনের ভিসা ব্যবহার করেছিলেন।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে বিচারপতি অমিত মহাজন আরও কয়েকটি অসঙ্গতির বিষয় উল্লেখ করেন। আদালতে উপস্থাপিত কাগজপত্রে ওই নারীর বাবা-মা ও স্বামীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যে পার্থক্য পাওয়া যায়। ভারতে আসার উদ্দেশ্য হিসেবে ব্যবসার কথা উল্লেখ করলেও তার কাছে কোনো ব্যবসায়িক পরিচয়পত্র বা আমন্ত্রণপত্র ছিল না।
এমনকি নিজ দেশে পরিচালিত ব্যবসা সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারেননি ওই নারী। আদালতের নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ব্যবসায়িক ভিসা নেওয়া হলেও তিনি নিজেকে পেশাগত পরিচয়ে ‘গৃহিণী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
মামলার সার্বিক পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট নথি এবং কর্তৃপক্ষের উপস্থাপিত তথ্য বিবেচনা করে আদালত ওই নারীর আবেদন খারিজ করে দেন।
আদালত বলেন, মামলার সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ওই নারীর ভারতে প্রবেশের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, কোনো বিদেশি নাগরিকের ভারতে প্রবেশের এমন কোনো স্বাভাবিক বা আইনগতভাবে নিশ্চিত অধিকার নেই, যা বৈধ ভিসা থাকার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।





