ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে রাধারানীর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। বৈষ্ণব ধর্মীয় ঐতিহ্যে রাধাকে কৃষ্ণের পরম প্রিয় সঙ্গিনী হিসেবে মানা হয়। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পালিত হয় রাধাষ্টমী। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই তিথি রাধারানীর আবির্ভাবতিথি হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পেয়ে আসছে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকে এদিন উপবাস ও পূজার মাধ্যমে রাধারানীর আরাধনা করেন। বিভিন্ন পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রত পালনের রীতি ও আচার-অনুষ্ঠানে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও ভক্তি, সংযম ও পূজার্চনা এ দিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
রাধাষ্টমী কেন পালন করা হয়?
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণের জন্মের ১৫ দিন পর রাধারানীর আবির্ভাব ঘটে। তাই ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিকে রাধার জন্মতিথি হিসেবে পালন করা হয়।
রাধাষ্টমীর দিন রাধারানীর পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণের আরাধনাও করা হয়। বৈষ্ণব ঐতিহ্যে রাধা-কৃষ্ণের যুগল আরাধনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাধাষ্টমী ব্রত পালনের প্রচলিত নিয়ম
রাধাষ্টমী ব্রত পালনের আগে প্রয়োজনীয় পূজার সামগ্রী প্রস্তুত করে নেওয়া হয়। প্রচলিত রীতিতে ফুল, ফল, আতপ চাল, সিদ্ধ চাল এবং বিভিন্ন ধরনের নৈবেদ্য সংগ্রহ করা হয়।
ব্রত পালনের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রথমে সংকল্প নেওয়া হয়। অনেকে সারাদিন উপবাস থেকে রাধারানী ও তাঁর অষ্টসখীর পূজা করেন। পাশাপাশি বৃষভানু ও নন্দরাজার স্মরণ ও পূজার প্রচলনও রয়েছে।
পরদিন ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবদের সাধ্য অনুযায়ী ভোজন করানোর মাধ্যমে ব্রত সমাপ্ত করার রীতি কিছু পরিবারে অনুসরণ করা হয়।
রাধাষ্টমীতে হলুদ রঙের গুরুত্ব
রাধাষ্টমীর সঙ্গে হলুদ রঙের একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্পর্কের কথা প্রচলিত রয়েছে। ভক্তদের অনেকে এদিন হলুদ পোশাক পরেন এবং পূজার আয়োজনেও হলুদ রঙ ব্যবহার করেন।
রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ বা ছবি হলুদ কাপড়ের ওপর স্থাপন করে ফুল ও ফল নিবেদন করার রীতিও রয়েছে। সামর্থ্য ও স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী হলুদ রঙের নৈবেদ্যও দেওয়া হয়।
রাধারানীকে কী ফুল ও ফল নিবেদন করবেন?
রাধারানীর পূজায় বিভিন্ন ধরনের ফুল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। ধর্মীয় রীতিতে পদ্ম, কদম, বকুল, মালতী ও কাঠগোলাপসহ নানা ফুল নিবেদনের কথা বলা হয়।
ফলের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল দেওয়া যেতে পারে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, আতাফল রাধারানীর প্রিয় ফলগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ভোগের ক্ষেত্রে মুখি কচু দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পদ নিবেদনের রীতিও কিছু অঞ্চলে প্রচলিত। এর পাশাপাশি ঘরে তৈরি বিভিন্ন মিষ্টান্নও নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া যেতে পারে।
বাড়িতে রাধাষ্টমীর পূজা করার পদ্ধতি
বাড়িতে সহজভাবে রাধাষ্টমীর পূজা করতে চাইলে ভোরে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরার মাধ্যমে পূজার প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
এরপর পরিষ্কার স্থানে একটি পিঁড়ি বা উঁচু আসন স্থাপন করে সেখানে রাধারানীর ছবি বা রাধা-মাধবের বিগ্রহ রাখা হয়। প্রচলিত রীতিতে অগরু মিশ্রিত চন্দন দিয়ে অষ্টদল পদ্মের নকশা তৈরি করা হয়।
পূজার স্থানে একটি তামার কলসিতে পানি রাখা যেতে পারে। এরপর সিঁদুর, কুমকুম, চাল, ফুল, ধূপ ও প্রদীপ দিয়ে পূজার্চনা করা হয়।
অভিষেক ও পূজার্চনা
রাধারানীর অভিষেকের ক্ষেত্রে দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনি দিয়ে তৈরি পঞ্চামৃত ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। অভিষেকের পর ফুল ও চন্দন দিয়ে বিগ্রহ সাজানো হয়।
বৈষ্ণব রীতিতে শ্রীকৃষ্ণের চরণে তুলসী পাতা এবং রাধারানীর চরণে ফুল নিবেদনের কথা বলা হয়। এরপর ভক্তি সহকারে ভোগ নিবেদন ও রাধা-কৃষ্ণের মঙ্গল আরতি করা হয়।
পূজা শেষ হলে প্রসাদ ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। উপবাস পালনকারীরা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে ব্রত শেষ করেন।
রাধাষ্টমী ব্রতের ধর্মীয় তাৎপর্য
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে রাধা ও কৃষ্ণের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বৈষ্ণব ঐতিহ্যে রাধারানীর আরাধনাকে কৃষ্ণভক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়।
রাধাষ্টমীতে রাধারানীর পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণের পূজাও করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে এ ব্রত পালন করলে ঈশ্বরের কৃপা লাভ করা যায়।
বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যেও রাধাষ্টমী ব্রত পালনের প্রচলন রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন রাধা-কৃষ্ণের আরাধনা করলে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, পারিবারিক শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে।
তবে ব্রত ও পূজার নিয়ম অঞ্চল, পরিবার এবং সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতির ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তাই স্থানীয় পুরোহিত বা নিজ সম্প্রদায়ের প্রচলিত বিধি অনুসরণ করাই শ্রেয়।





