বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একটি রাষ্ট্রের শক্তি ও প্রভাব বিস্তারের পেছনে ভূখণ্ডের আয়তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে শুধু বিশাল ভূখণ্ড থাকলেই কোনো দেশ পরাশক্তিতে পরিণত হয় না। ইতিহাস দেখায়, সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, অর্থনীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির ভিত্তি তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বিস্তারের ইতিহাসে ক্রয়, চুক্তি, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সমঝোতার বিভিন্ন অধ্যায় রয়েছে। রাশিয়া ও চীনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে যুদ্ধ, সাম্রাজ্য বিস্তার, সীমান্ত পরিবর্তন ও রাজনৈতিক একীকরণের মাধ্যমে ভূখণ্ডের পরিবর্তন ঘটেছে। আবার কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দক্ষিণ আমেরিকার বৃহৎ রাষ্ট্র ব্রাজিলও পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্য দিয়ে বর্তমান ভৌগোলিক কাঠামো লাভ করেছে।
মাঞ্চুরিয়া থেকে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি
একসময় মাঞ্চুরিয়া ছিল উত্তর-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অঞ্চল। মাঞ্চুদের ছিং রাজবংশ ১৬৪৪ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত চীন শাসন করে। পরবর্তী সময়ে সাম্রাজ্যিক চীন, রাশিয়া, জাপান এবং শেষ পর্যন্ত আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে মাঞ্চুরিয়ার ভাগ্য ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।
আমুর ও উসুরি নদীর মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের একটি বড় অংশ উনিশ শতকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৮৬০ সালে রাশিয়া ভ্লাদিভস্তোক প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তীতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নৌকৌশলগত ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
আরও পড়ুনঃ বোরকা, অপরাধ ও ধর্মীয় অনুভূতি: পোশাককে ঘিরে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন
ভ্লাদিভস্তোকের অবস্থান রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ভূখণ্ড, বন্দর ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আজও রাশিয়া-চীন সম্পর্কের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তিব্বত ও এশিয়ার জলসম্পদ
চীনের সঙ্গে তিব্বতের সম্পর্কও এশিয়ার ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৫০-৫১ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাবলির পর তিব্বত কার্যত চীনের নিয়ন্ত্রণে আসে।
তিব্বত মালভূমিকে প্রায়ই ‘এশিয়ার জলের টাওয়ার’ বলা হয়। কারণ এ অঞ্চলের হিমবাহ ও নদী-উৎস থেকে এশিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ নদী প্রবাহিত হয়েছে। ইয়াংসি, হুয়াংহো, মেকং, সালউইন, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধুসহ একাধিক নদীর উজানের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে তিব্বত মালভূমির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে তিব্বত শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; পানি, পরিবেশ, কৃষি, জলবিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার দিক থেকেও এর গুরুত্ব অসাধারণ।
চীন-ভারত সম্পর্কের অন্যতম বড় বাস্তবতা
তিব্বত ও হিমালয় অঞ্চলের সীমান্ত বিরোধ চীন-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর একটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত অবকাঠামো, নদীর পানি, বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যের মতো বিষয়।
আরও পড়ুনঃ ভারত থেকে ইলিশ আমদানি: ‘হারাম’ তকমা নিয়ে এবার উঠছে প্রশ্ন
বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের উজানে চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে ভারত ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে পানি ও পরিবেশ ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বড় ভূখণ্ডই কি পরাশক্তির পরিচয়?
বিশাল ভূখণ্ড একটি রাষ্ট্রকে প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, জ্বালানি, সামরিক কৌশল এবং ভূরাজনৈতিক গভীরতার ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু এগুলো একাই পরাশক্তি হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ইসরায়েলের মতো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্র দেখিয়েছে—সীমিত ভূখণ্ডের মধ্যেও প্রযুক্তি, শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো এবং কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি দেশ আন্তর্জাতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।
সুতরাং একটি রাষ্ট্রের শক্তি পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু মানচিত্রের আয়তন দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্ঞান, মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক প্রযুক্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার সমন্বয়ই একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করে।
ভূখণ্ড রাষ্ট্রের শক্তির একটি উপাদান হতে পারে; কিন্তু সেই ভূখণ্ডকে উৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত করার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত একটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।





