বাঙালির রসনায় ইলিশের জায়গা অনন্য। কিন্তু সেই ইলিশকে ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। যে দেশে ইলিশকে জাতীয় মাছ হিসেবে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়, যে দেশের পদ্মার ইলিশ প্রতিবছর ভারতের বাজারেও বিশেষ চাহিদা তৈরি করে, সেই বাংলাদেশেই এবার ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি হচ্ছে।
আর এই আমদানি শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার বাজার থেকেই নয়—ভারতের গুজরাট উপকূল থেকেও ইলিশ আসছে বাংলাদেশের বাজারে।
প্রশ্ন উঠছে, ইলিশের পরিচয় কি তার উৎসভেদে বদলে যায়? একটি মাছ বাংলাদেশে ধরা পড়লে সেটি ‘দেশি’ আর ভারতের উপকূলে ধরা পড়লে সেটি অন্য কোনো পরিচয় পায়? নাকি মাছের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত বাজার, চাহিদা ও অর্থনীতিই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা?
দুই মাসে এসেছে সাড়ে ৩ লাখ কেজির বেশি ইলিশ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ। এর মধ্যে জুলাইয়ে আমদানি হয়েছিল ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি। আগস্টে আমদানি এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজিতে।
আরও পড়ুনঃ বোরকা, অপরাধ ও ধর্মীয় অনুভূতি: পোশাককে ঘিরে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা।
অর্থাৎ যে দেশ ঐতিহাসিকভাবে ইলিশ উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য পরিচিত, সেই দেশের বাজারেই এখন বিদেশি ইলিশের প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
গুজরাট থেকেও আসছে ইলিশ
ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারতের গুজরাটে ইলিশের সরবরাহ ভালো থাকায় তুলনামূলক কম দামে মাছ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা থাকায় এসব মাছ বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে আমদানি করা ইলিশ পৌঁছেছে। কিছু মাছের ডিম আলাদা করে বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কিছু মাছ নোনা ইলিশ হিসেবেও বাজারজাত করা হচ্ছে।
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাংলাদেশে আরও ১০০ থেকে ১৫০ টন ইলিশ পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
যে ইলিশ নিয়ে একসময় ছিল উল্টো বাণিজ্য
দুই বাংলার মধ্যে ইলিশের বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় ভারতে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা বেড়ে যায়। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট শর্তে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতিও দিয়েছে।
কিন্তু এবার দৃশ্যপট যেন উল্টে গেছে। বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ভারত থেকেই ইলিশ আমদানি করতে হচ্ছে।
এটি শুধু একটি মাছের আমদানি-রপ্তানির হিসাব নয়; এর সঙ্গে দেশের মৎস্য উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা, ভোক্তার চাহিদা এবং ইলিশের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
‘হারাম’ ইলিশের প্রশ্নটি তাহলে কোথায়?
ইলিশ খাওয়া নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় নানা ধর্মীয় বক্তব্য ও সামাজিক বিতর্ক দেখা গেছে। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখের সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে কিছু ধর্মীয় বক্তার আপত্তির কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। কোথাও কোথাও ইলিশকে একটি বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে তা খাওয়ার বিরুদ্ধেও বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—খাদ্যের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, বাজারে চাহিদা তৈরি হলে সেই পণ্যই শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায়।
এখন প্রশ্নটি তাই আরও সরাসরি—বাংলাদেশের নদীতে ধরা ইলিশ যদি কারও কাছে ধর্মীয় কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে ভারতের গুজরাট উপকূলে ধরা একই প্রজাতির ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি হলে তার পরিচয় কি বদলে যায়?
মাছ কি সীমান্ত পেরোলেই তার ধর্ম বদলায়? নাকি ‘হারাম’ কিংবা ‘হালাল’ তকমার চেয়ে এখানে অর্থনীতি, খাদ্যচাহিদা এবং বাজারের বাস্তবতাই বড় হয়ে ওঠে?
ভারতবিরোধী বক্তব্য বনাম বাস্তব বাণিজ্য
ভারতীয় পণ্য ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ভারতবিরোধী বক্তব্য, পণ্য বর্জনের আহ্বান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রচারণাও দেখা গেছে।
কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি-রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামালসহ নানা ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাস্তবতার জায়গা থেকে পরিচালিত হয়।
ইলিশ আমদানির সাম্প্রতিক চিত্রও সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
রাজনীতি ও আবেগের বাইরে গিয়ে দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার—ভোক্তার চাহিদা, সরবরাহ ও দাম যেখানে কাজ করে, সেখানে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তও সেভাবেই পরিবর্তিত হয়।
দেশি ও আমদানি করা ইলিশে দামের বিশাল পার্থক্য
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ১ কেজি ২০০ থেকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ প্রতি কেজি ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
একই আকারের আমদানি করা ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে।
দামের এই বড় পার্থক্যের কারণে স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতাদের একটি অংশ আমদানি করা ইলিশের দিকে ঝুঁকছেন। এতে দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।
আসল সংকট ইলিশের উৎপাদনে
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এত বড় উৎপাদক দেশকে কেন নিজের বাজারের চাহিদা মেটাতে বিদেশি ইলিশের দিকে তাকাতে হচ্ছে?
মৎস্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের মতে, নদীদূষণ, নাব্যসংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইলিশের আবাসস্থল ও চলাচলের ওপর চাপ তৈরি করছে। উৎপাদন কমে গিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরতা বাড়লে তা বাংলাদেশের ইলিশ সম্পদের ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
তাই ‘ইলিশ কার’, ‘কোথা থেকে এসেছে’ কিংবা ‘কোন দেশের ইলিশ’—এসব বিতর্কের পাশাপাশি মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়: বাংলাদেশের নদী ও সমুদ্রে ইলিশের উৎপাদন কীভাবে টেকসইভাবে বাড়ানো যায়?
কারণ ইলিশের কোনো ধর্ম নেই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ও নেই। তার পরিচয়—সে একটি মাছ। আর তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে সে একটি ঐতিহ্য।





