বোরকা, অপরাধ ও ধর্মীয় অনুভূতি: পোশাককে ঘিরে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন

বোরকা, অপরাধ ও ধর্মীয় অনুভূতি: পোশাককে ঘিরে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন
বোরকা, অপরাধ ও ধর্মীয় অনুভূতি: পোশাককে ঘিরে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন
ধর্মীয় পোশাকের সঙ্গে অপরাধের সম্পর্ক কতটা যৌক্তিক—এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নোয়াখালীর চৌমুহনীতে আবাসিক হোটেলে পুলিশের অভিযানের পর। অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি আবাসিক হোটেল থেকে যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে ১২ জন নারী ও ৬ জন পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন নারী বোরকা পরিহিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূলত একটি প্রশ্ন ঘুরছে—কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় পোশাক ব্যবহার করে অপরাধে জড়ালে সেই পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়কে কি দায়ী করা যায়?

ধর্মীয় পোশাক অপরাধের প্রমাণ নয়

বোরকা, হিজাব কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় পোশাক একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সংস্কৃতি বা সামাজিক পরিচয়ের অংশ হতে পারে। একইভাবে কোনো অপরাধী ধর্মীয় পোশাক ব্যবহার করলে তার অপরাধের দায় পোশাক বা পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপানোও যুক্তিসঙ্গত নয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে অপরাধ তদন্ত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া। পোশাক দেখে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন বৈষম্যমূলক, তেমনি অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে কোনো পোশাককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হলেও সেটি তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত।

পরিচয় গোপন ও নিরাপত্তা—দুই দিকেই ভারসাম্য প্রয়োজন

বোরকা বা নিকাবের কারণে পরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ে বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকিং, বিমানবন্দর বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে ধর্মীয় অনুভূতি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি কার্যকর শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর পরিচয় যাচাই, নারী কর্মকর্তার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা কিংবা নির্দিষ্ট গোপনীয় পরিবেশে যাচাইয়ের মতো ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।

অপরাধের বিচার হবে অপরাধের ভিত্তিতে

চৌমুহনীর ঘটনাটি সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই স্বাভাবিক। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন—কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের কারণে কোনো ধর্ম, ধর্মীয় পোশাক কিংবা একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না।

একইভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠলে আইন হাতে তুলে নেওয়া, বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা কোনো সম্প্রদায়ের ওপর হামলারও কোনো বৈধতা নেই। অভিযোগের বিচার হতে হবে রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন ও আদালতের মাধ্যমে।

ধর্মীয় ইতিহাসের প্রসঙ্গেও সতর্কতা জরুরি

লেখাটিতে ইসলামের প্রাথমিক যুগের নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিভিত্তিক বিবাহ বা মুতআ-এর প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামী ফিকহে ঐতিহাসিক ও মতপার্থক্যপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন মুসলিম মতবাদে এর বৈধতা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান দেখা যায় এবং সুন্নি ইসলামী ফিকহের প্রচলিত অবস্থান অনুযায়ী মুতআ বিবাহ বৈধ নয়।

তাই কোনো আধুনিক যৌন ব্যবসা বা পতিতাবৃত্তিকে ঐতিহাসিক ধর্মীয় প্রথার সঙ্গে সরাসরি এক করে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা তথ্যগত ও ধর্মতাত্ত্বিকভাবে বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত আইনের শাসন

বোরকা পরে কেউ অপরাধ করলে অপরাধের বিচার হওয়া উচিত; আবার বোরকা পরা কোনো নিরপরাধ নারীকে শুধুমাত্র পোশাকের কারণে সন্দেহ বা হয়রানি করাও উচিত নয়।

ধর্মীয় পরিচয়, পোশাক কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে অপরাধকে এক করে দেখার পরিবর্তে প্রত্যেক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করাই ন্যায়সংগত। একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা প্রতিশোধের সংস্কৃতিও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মর্যাদা, নারী-পুরুষের অধিকার এবং আইনের শাসন—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হয়। চৌমুহনীর ঘটনাও সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিই সামনে এনেছে: অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই কি বিচারের মূল ভিত্তি হবে না?

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

বিশেষ প্রতিনিধি

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।