তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তায়িপ এরদোয়ানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ফিলিস্তিন সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাঁর অবস্থান নিয়ে বিশ্বব্যাপী মতভেদ স্পষ্ট। এক দল সমালোচকের চোখে তাঁর পদক্ষেপগুলো “রাজনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক,” অন্যদিকে সমর্থকদের দৃষ্টিতে তিনি এক “সাহসী বৈশ্বিক নেতা।”
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল নীতি: অবস্থান ও সমালোচনা
ফিলিস্তিন ইস্যুতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এরদোয়ানের দেওয়া বক্তব্য এবং কবিতা আবৃত্তি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে সমালোচকদের দাবি, এই বক্তব্যগুলো অনেকটাই বাগাড়ম্বর বা রাজনৈতিক কৌশল। ১৯৪৯ সালে তুরস্কের দেওয়া ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বাতিল না করা এবং দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাকে তারা তাঁর নীতির প্রধান বৈপরীত্য বলে মনে করেন।
অন্যদিকে, আঙ্কারার মতে—ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র তুরস্কই প্রকাশ্যে হামাসকে স্বাধিকার আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক ফোরামে ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের নীতির বিরোধিতা এবং গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়ে আঙ্কারার বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন সমর্থকরা।
সিরিয়া ও কুর্দি পরিস্থিতি
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের প্রক্রিয়ায় তুরস্কের সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় আজাজ, আল-বাব, জারাবুলুস এবং আফরিনের মতো এলাকায় তুর্কি সামরিক উপস্থিতি ও একাধিক অভিযানের (যেমন: ‘অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চ’) ফলে সীমান্ত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ মূলত তুরস্কের হাতে এসেছে। সমালোচকরা একে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে “অনধিকার প্রবেশ ও দখলদারিত্ব” হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। আঙ্কারার দাবি, সিরিয়া সীমান্ত দিয়ে পিকেকে (PKK) ও ওয়াইপিজি (YPG)-র সন্ত্রাসী তৎপরতা রোখা এবং নিজেদের সীমান্তে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলাই এসব সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য। এছাড়া তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ সিরীয় শরণার্থীকে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরির যুক্তিতেও এই পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই দেওয়া হয়।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ক্ষমতার বিন্যাস
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এরদোয়ানের অভ্যন্তরীণ শাসনপদ্ধতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা রয়েছে। ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর হাজার হাজার সামরিক কর্মকর্তা, বিচারক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠানো এবং সংসদীয় ব্যবস্থা পরিবর্তন করে একক নির্বাহী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার চালু করার পদক্ষেপকে বিরোধী দলগুলো “স্বৈরাচারী” হিসেবে চিহ্নিত করে। ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগ্লুর বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপগুলোকেও বিরোধীরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে আখ্যা দেয়।
অপরদিকে, এরদোয়ানের অনুসারীরা তাঁর প্রতিটি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও নির্বাচনে জয়লাভকে তুলে ধরেন। তাদের মতে, ক্যু ভেস্তে দিয়ে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দীর্ঘদিনের সামরিক প্রভাব মুক্ত করে দেশকে স্থিতিশীল রাখতে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
আন্তর্জাতিক ভারসাম্য ও কৌশল
যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে এরদোয়ানের কূটনৈতিক সম্পর্ককে অনেক বিশ্লেষক “বহুমুখী ভারসাম্য রাজনীতি” বা “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন” হিসেবে দেখেন। ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনা, আবার ইউক্রেনকে ড্রন সরবরাহ করা—এমন বিপরীতমুখী কৌশল বিশ্বরাজনীতিতে তুরস্কের নিজস্ব প্রভাব বিস্তারেরই অংশ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক আদর্শের বিচারে প্রতিটি নেতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভিন্ন। ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপট ও ১৯৭৩ সালে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ঘোষণা—”বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত, শোষক আর শোষিত; আমি শোষিতের পক্ষে”—ছিল সম্পূর্ণ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও আপসহীন মুক্তি সংগ্রামের প্রতীক। অন্যদিকে, বর্তমান বিশ্বের জটিল রাজনৈতিক মেরুকরণে এরদোয়ানের অবস্থান তুরস্কের জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের হিসাব-নিকাশের ওপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে।





