নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সাহসী নারী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতি দিবস আজ। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পর ব্রিটিশ পুলিশের হাতে আটক হওয়ার আশঙ্কায় পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করে আত্মাহুতি দেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার এবং মা প্রতিভা ওয়াদ্দেদার। শৈশব থেকেই মেধাবী প্রীতিলতা শিক্ষাজীবনে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। চট্টগ্রামের ড. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য কলকাতায় যান।
শিক্ষাজীবনে থাকার সময়ই বিপ্লবী ও স্বদেশি আন্দোলনের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। কলকাতার বেথুন কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রীসংঘের সঙ্গেও যুক্ত হন। বিপ্লবীদের গোপন কর্মকাণ্ড ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
পড়াশোনা শেষ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং নন্দনকাননের অর্পণাচরণ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।
সূর্য সেনের বিপ্লবী দলে প্রীতিলতা
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম নেতা মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে প্রীতিলতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বিপ্লবী কল্পনা দত্তের সহযোগিতায় তাঁর দেখা হয় সূর্য সেন ও নির্মল সেনের সঙ্গে। পরে তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও যুব বিদ্রোহের পর ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে। অনেক বিপ্লবী গ্রেপ্তার হন, কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে নারী বিপ্লবীদেরও বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আরও পড়ুনঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার বৈঠক
তৎকালীন ব্রিটিশ গোয়েন্দা নজরদারিতে নারীরা তুলনামূলকভাবে কম সন্দেহের মুখে পড়তেন। ফলে বিপ্লবীদের মধ্যে চিঠিপত্র আদান-প্রদান, যোগাযোগ রক্ষা এবং বিভিন্ন উপকরণ বহনের মতো কাজে নারীদের সম্পৃক্ত করা হয়। প্রীতিলতাও এসব কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসি বদলে দেয় তাঁর জীবন
১৯৩১ সালের ৪ আগস্ট বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসি প্রীতিলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এ ঘটনার পর সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে আরও তীব্র হয়।
এরপর বিপ্লবীদের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীরা পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর আগে একই স্থাপনায় হামলার একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল।
ইউরোপিয়ান ক্লাবে ঐতিহাসিক আক্রমণ
১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে মাস্টারদা সূর্য সেন ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণের নতুন পরিকল্পনা করেন। প্রথমে নারী বিপ্লবীদের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনার কথা ভাবা হলেও কল্পনা দত্ত গ্রেপ্তার হওয়ায় নেতৃত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ওপর।
২৩ সেপ্টেম্বর রাতে বিপ্লবীদের একটি দল পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের দিকে অগ্রসর হয়। পুরুষের পোশাকে ছদ্মবেশে থাকা প্রীতিলতার নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়। তাঁর সংকেতের পর বিপ্লবীরা ক্লাবের দিকে গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করেন। ব্রিটিশ পক্ষ থেকেও পাল্টা গুলি চালানো হয়।
অভিযানের একপর্যায়ে প্রীতিলতা গুলিবিদ্ধ হন। এরপর দলটি সরে যাওয়ার সময় তিনি কিছুদূর পর্যন্ত সহযোদ্ধাদের সঙ্গে এগিয়ে যান। ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে বিপ্লবী সংগঠনের তথ্য প্রকাশের আশঙ্কায় সঙ্গে থাকা পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন তিনি।
এভাবেই মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জীবনাবসান ঘটে।
ইতিহাসে অমর প্রীতিলতা
প্রীতিলতার আত্মাহুতি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী হিসেবেই নন, তৎকালীন সমাজে নারীর ভূমিকা ও সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবেও স্মরণীয়।
শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেও তিনি স্বাধীনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ়তার কারণে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তিনি ‘অগ্নিকন্যা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
আরও পড়ুনঃ আজ বামন দ্বাদশী ও বামন জয়ন্তী: ভগবান বিষ্ণুর বামন অবতারের কাহিনি
প্রীতিলতার জীবন দেখিয়েছে, উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীরাও সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর আত্মত্যাগ আজও ইতিহাস, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় আলোচিত হয়।
প্রতি বছর ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁর আত্মাহুতি দিবসে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের সেই ঘটনা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নামকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।





