আজ বামন দ্বাদশী ও বামন জয়ন্তী: ভগবান বিষ্ণুর বামন অবতারের কাহিনি

আজ বামন দ্বাদশী ও বামন জয়ন্তী: ভগবান বিষ্ণুর বামন অবতারের কাহিনি
বামন দ্বাদশী ও বামন জয়ন্তী: ভগবান বিষ্ণুর বামন অবতারের কাহিনি

আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন—শ্রীবামন দ্বাদশী ও বামন জয়ন্তী। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই তিথিতেই ভগবান বিষ্ণু বামন রূপে অবতীর্ণ হয়ে অসুররাজ মহারাজ বলির অহংকার ও ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করেন এবং একই সঙ্গে তাঁর সত্যনিষ্ঠা ও দানের মহত্ত্বকে স্বীকৃতি দেন।

বামনদেবকে পুরাণে ভগবান বিষ্ণুর পঞ্চম অবতার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অবতারকে ‘বামনাবতার’ এবং বিশ্বজয়ী রূপে ‘ত্রিবিক্রম’ নামেও অভিহিত করা হয়।

অদিতির প্রার্থনা ও বামনদেবের আবির্ভাব

পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় অসুরদের কাছে পরাজিত হয়ে দেবতারা তাদের অবস্থান ও কর্তৃত্ব হারান। দেবতাদের এই দুরবস্থা দেখে দেবমাতা অদিতি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি ভগবান বিষ্ণুর আরাধনা করে দেবতাদের রক্ষার জন্য একজন শক্তিশালী সন্তানের প্রার্থনা করেন।

অদিতির ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু তাঁকে আশ্বাস দেন যে তিনি মহর্ষি কশ্যপের পুত্র হিসেবে অদিতির গর্ভে আবির্ভূত হবেন। পরবর্তীতে যথাসময়ে বিষ্ণু অদিতির গর্ভ থেকে বামন রূপে জন্মগ্রহণ করেন। দেবরাজ ইন্দ্রের ভ্রাতা হওয়ায় তাঁর আরেক নাম হয় ‘উপেন্দ্র’।

মহারাজ বলির যজ্ঞ

সেই সময়ে অসুরদের রাজা মহারাজ বলি শক্তিশালী হয়ে ত্রিভুবনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তিনি তাঁর গুরু শুক্রাচার্যের নির্দেশ অনুসারে একটি বৃহৎ যজ্ঞের আয়োজন করেন।

যজ্ঞ চলাকালে বামনদেব এক ক্ষুদ্রকায় ব্রাহ্মণের বেশে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হন। মহারাজ বলির কাছে তিনি দান হিসেবে মাত্র তিন পা পরিমাণ ভূমি প্রার্থনা করেন।

বামনদেবের এই সামান্য চাওয়ায় মহারাজ বলি সম্মত হলেও তাঁর গুরু শুক্রাচার্য বিষয়টি বুঝতে পারেন। তিনি বলিকে সতর্ক করেন এবং দান করতে নিষেধ করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও দানের সংকল্প থেকে বলি সরে আসেননি।

তিন পায়ে বিশ্বজগত পরিমাপ

মহারাজ বলি দানের সংকল্প সম্পন্ন করার পর বামনদেব তাঁর প্রকৃত মহাজাগতিক রূপ প্রকাশ করতে শুরু করেন। ক্ষুদ্র বামনদেহ মুহূর্তের মধ্যে বিশাল ত্রিবিক্রম রূপ ধারণ করে সমগ্র বিশ্বজগতকে পরিব্যাপ্ত করে ফেলে।

পুরাণকথা অনুযায়ী, তাঁর প্রথম পদক্ষেপে স্বর্গলোক এবং দ্বিতীয় পদক্ষেপে পৃথিবীসহ অন্যান্য লোক পরিমাপ হয়ে যায়। এরপর তৃতীয় পদক্ষেপ রাখার জন্য আর কোনো স্থান অবশিষ্ট থাকে না।

তখন ত্রিবিক্রম রূপী ভগবান বিষ্ণু মহারাজ বলিকে প্রশ্ন করেন—তাঁর তৃতীয় পদক্ষেপ কোথায় রাখা হবে?

বলির মস্তকে তৃতীয় পদক্ষেপ

প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও নিজের সত্যনিষ্ঠা বজায় রাখতে মহারাজ বলি নিজের মাথা নত করে দেন। তিনি ভগবানকে তাঁর মস্তকের ওপর তৃতীয় পদক্ষেপ রাখার অনুরোধ করেন।

ভক্তি ও সত্যনিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে বামনদেব বলির মাথায় তৃতীয় পদক্ষেপ রাখেন। পুরাণের কাহিনিতে এ ঘটনাকে বলির আত্মসমর্পণ, দানশীলতা ও প্রতিশ্রুতির প্রতি অবিচল থাকার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এ সময় ভক্তরাজ প্রহ্লাদও সেখানে উপস্থিত হন। তিনি তাঁর পৌত্র মহারাজ বলির সত্যনিষ্ঠা ও দানের মানসিকতার প্রশংসা করেন।

বলিকে সুতললোকে স্থান

পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, মহারাজ বলির দান, সত্য রক্ষা ও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু তাঁকে সুতললোকে স্থান দেন। বলা হয়, দেবতাদের কাছেও যে লোক দুর্লভ, সেই সুতললোকে বলির অবস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।

বামন অবতারের এই কাহিনিতে তাই শুধু দেবতা ও অসুরের সংঘাত নয়; সত্য, দান, প্রতিশ্রুতি, আত্মসমর্পণ ও ভক্তির মতো মূল্যবোধও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

শ্রীবামন দ্বাদশী ও বামন জয়ন্তী সেই ধর্মীয় বিশ্বাস ও পুরাণকথাকে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ তিথি। ভক্তদের কাছে দিনটি ভগবান বিষ্ণুর বামনাবতারকে স্মরণ, পূজা ও ধর্মীয় আচার পালনের দিন হিসেবে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।