সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন রুটে সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ৫ থেকে ২০ টাকা, আবার দূরপাল্লার বাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন রুটেও ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে যাত্রী ও পরিবহণকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।

গত রোববার রাতে সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর পরদিন সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাস, মিনিবাস ও লেগুনায় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ শুরু হয়।

মঙ্গলবার সকালেও রাজধানীর রায়সাহেব বাজার, গুলিস্তান, পল্টন ও শাহবাগ এলাকায় বিভিন্ন গণপরিবহনে যাত্রীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। পরে মঙ্গলবার বিকেলে সরকার কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানায়। তবে তার আগেই অনেক পরিবহণে নতুন ভাড়া কার্যকর করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

২০ টাকার ভাড়া ২৫ টাকা

মঙ্গলবার দুপুরে সায়েন্সল্যাব থেকে একটি সাভার পরিবহণের বাসে রায়সাহেব বাজারে আসেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি জানান, আগে এ পথে ২০ টাকা ভাড়া দিলেও ওইদিন তার কাছে ২৫ টাকা দাবি করা হয়। বাড়তি ভাড়া নিয়ে বাসের কর্মীদের সঙ্গে তার কিছুক্ষণ কথা-কাটাকাটিও হয়।

মিজানুর রহমান বলেন, ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ যাত্রীদের ওপরই সরাসরি আর্থিক চাপ পড়ছে।

অন্যদিকে, নতুনবাজার থেকে ভিক্টর পরিবহণের বাসে গুলিস্তানে আসা আফতাব আহমেদের কাছ থেকে ৩০ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা নেওয়া হয়। তার ভাষ্য, ভাড়া বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তা কার্যকর করা উচিত; সিদ্ধান্তের আগেই বাড়তি টাকা নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা দাবি

মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে ৮ নম্বর বাসে উঠে দৈনিক বাংলা মোড়ে নামেন বেসরকারি চাকরিজীবী মহিউদ্দিন। তার অভিযোগ, এ পথে এতদিন ভাড়া ছিল ১০ টাকা। কিন্তু ২০ টাকার নোট দেওয়ার পর কন্ডাক্টর তাকে ফেরত দেন মাত্র ৫ টাকা। অর্থাৎ ১৫ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়।

কন্ডাক্টর দাবি করেন, সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা করা হয়েছে। এ নিয়ে মহিউদ্দিনের সঙ্গে তার তর্ক হয়। যাত্রীর প্রশ্ন, সরকার ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত না নিলে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে কেন অতিরিক্ত ৫ টাকা দিতে হবে?

বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া

সাইনবোর্ড থেকে নতুনবাজারগামী ইকবাল পরিবহণের একটি এসি বাসে ১০০ টাকার পরিবর্তে ১২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রী ইব্রাহিম খলিল। তার দাবি, প্রতিদিন একই পথে যাতায়াতে তিনি ১০০ টাকা ভাড়া দেন। কিন্তু ওইদিন তার কাছ থেকে ২০ টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মহাখালী থেকে বিজয় সরণি পর্যন্ত বৈশাখী ও ভূঁইয়া পরিবহণে ১০ টাকার পরিবর্তে ১৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গুলিস্তান থেকে বিমানবন্দরগামী কয়েকটি পরিবহণেও ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

চিটাগাং রোড থেকে গুলিস্তানগামী বাসে ৫ টাকা বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও সাইনবোর্ড থেকে চলাচলকারী মৌমিতা, ঠিকানা, অনাবিল ও লাভলী পরিবহণেও রুট ও দূরত্ব অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চিটাগাং রোড থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত লেগুনায় ২০ টাকার ভাড়া ২৫ টাকা এবং ২৫ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের বন্ধন ও উৎসব পরিবহণেও ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এ রুটে ৫৫ টাকার পরিবর্তে ৬০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর সোমবার সকাল থেকেই চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, চকবাজার, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় বাস, টেম্পো ও হিউম্যান হলারে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহণকর্মীদের একাধিক স্থানে বাগবিতণ্ডা হয়। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়।

কাজীর দেউড়ি থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পথে মিনিবাসের ভাড়া ছিল ৭ টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে ১৫ টাকা নেওয়া হয়েছে। কোতোয়ালি মোড় থেকে জামালখান পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে ১৫ টাকা আদায় করা হয়েছে।

বহদ্দারহাট থেকে নতুন সেতু পর্যন্ত বাসভাড়া ১০ থেকে ১২ টাকা হলেও কোথাও ১২ থেকে ১৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই রুটে মাহিন্দ্রার ১৪ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।

কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ৩৫ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বহদ্দারহাট থেকে শিকলবাহা ক্রসিং পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ২২ টাকার পরিবর্তে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পটিয়া রুটে ৫৯ টাকার ভাড়া ৭০ থেকে ৭৫ টাকা এবং কেরানীহাট পর্যন্ত ১১২ টাকার ভাড়া ১৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন যাত্রীরা।

জ্বালানির দাম বাড়লেই ভাড়া বাড়ে—যাত্রীদের অভিযোগ

বাসযাত্রী নাসির উদ্দিন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমলে গণপরিবহণের ভাড়া আগের মতো কমানো হয় না। কিন্তু দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

তার আরও অভিযোগ, গ্যাসচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রেও ডিজেলচালিত বাসের মতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় সরকার গণপরিবহণের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিলেও সরকারি নির্ধারিত নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগে পরিবহণ মালিক বা শ্রমিকদের নিজস্বভাবে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর ও অতিরিক্ত আদায় বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

দ্য নিউজ রিপোর্ট

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।