চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন অসুস্থ ও আহত হয়েছেন।
শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সকালে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাংকে গ্যাস লিকেজ দেখা দেয়। এ সময় স্থানীয় ও বহিরাগত কয়েকজন বিষয়টি দেখতে সেখানে গেলে গ্যাসে আক্রান্ত হন।
কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গুরুতর অসুস্থ কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, দুপুর ১২টার পর ভাটিয়ারীর ওই ইয়ার্ড থেকে আহত ছয়জনকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইয়ার্ডে দুইজন এবং চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে এ ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে।
নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন—সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। তারা সবাই ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।
গ্যাসের তীব্র গন্ধে আতঙ্ক
দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডসংলগ্ন এলাকায় বিষাক্ত গ্যাসের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। স্থানীয় জেলেদের দাবি, গ্যাসের গন্ধ এতটাই তীব্র ছিল যে সাগর থেকে ফেরার সময় তারা কারখানার পাশের খালে নৌকা ভেড়াতে পারেননি। নিরাপত্তার কারণে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা নোঙর করতে হয়েছে তাদের।
এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, হঠাৎ ইয়ার্ডের ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুনতে পান তারা। পরে ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে কয়েকজনকে অসুস্থ অবস্থায় গাড়িতে করে হাসপাতালে নিতে দেখা যায়। এরপর জাহাজের ভেতরে কয়েকজনের মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
পরে শতাধিক বিক্ষুব্ধ মানুষ ইয়ার্ডে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় বলে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এ সময় ইয়ার্ডের বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
তদন্ত শুরু
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানান, জাহাজ থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস নির্গমনের কারণ এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পর সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলামও ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ দাবি করেন, স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে বিস্ফোরণের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তার দাবি, বিস্ফোরণের পর ১০ জন আহত শ্রমিককে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে ঘটনার সময় নিহত ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ, জাহাজের ট্যাংকে কী ধরনের গ্যাস ছিল এবং নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে।





