নিজস্ব প্রতিবেদক, দ্য নিউজ: শারদীয় দুর্গাপূজার মতো বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব আয়োজন করতে গিয়ে পুলিশ, ড্রোন ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পাহারার ওপর নির্ভর করতে হওয়াকে দুর্ভাগ্যজনক ও অপমানজনক বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ হিন্দু সম্মিলন সংঘ। সংগঠনটি পূর্বে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে পরিচিত ছিল।
সংগঠনটির মতে, একটি স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক দেশে ধর্মীয় উৎসব পালনের ক্ষেত্রে এমন নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামাজিক সম্প্রীতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের সমঅধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অনিরাপত্তাবোধ বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
সংগঠনের জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ডা. মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ পরিস্থিতির স্থায়ী অবসান, স্বাভাবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পূজাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং সামাজিক সম্প্রীতি পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন
বাংলাদেশ হিন্দু সম্মিলন সংঘের বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আদর্শ ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, সমঅধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও ধর্মীয় উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে যদি বিশেষ পাহারা ও নজরদারির ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সংগঠনটির মতে, ধর্মীয় উৎসবের মূল বৈশিষ্ট্য হলো আনন্দ, স্বতঃস্ফূর্ততা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি। কিন্তু উৎসবের পরিবেশ যখন অতিরিক্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী ও পাহারার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন পূজার স্বাভাবিক আনন্দ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে পূজার্থী মানুষের মধ্যে নিজেদের নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
সাময়িক পাহারা নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান
সংগঠনটি মনে করে, দুর্গাপূজার সময় সাময়িকভাবে মণ্ডপে মণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন হতে পারে। তবে শুধু পাহারা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অনাস্থা ও সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সব ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা এবং নাগরিক সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এ দায়িত্ব পালনে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে নিজেদের ধর্মীয় উৎসব আয়োজনের জন্য বিশেষ পাহারা বা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে না হয়।
উপাসনালয় ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার আহ্বান
বাংলাদেশ হিন্দু সম্মিলন সংঘের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, ড্রোন কিংবা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পাহারার মাধ্যমে সাময়িক নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরির পরিবর্তে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জানমাল, উপাসনালয় ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সংগঠনটি একটি স্থায়ী, স্বাভাবিক ও বৈষম্যহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয় উৎসব যেন ভীতি বা অনিশ্চয়তার মধ্যে নয়, বরং স্বাধীনতা, মর্যাদা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পরিবেশে উদ্যাপিত হতে পারে—সেই লক্ষ্যেই রাষ্ট্র ও সমাজকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।





