দেশের জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তুলতে বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুই শিল্পের প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে পৃথক সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান।
সভায় জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে পরিবেশ সুরক্ষায় জোর
সভায় জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। এ খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দেশীয় ইস্পাত শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ করছে। একই সঙ্গে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে সার্কুলার ইকোনমিতে এ শিল্পের বড় অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে।
তবে শিল্পটির সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য নিরাপদে ব্যবস্থাপনা, বর্জ্যপানি পরিশোধন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, দূষিত মাটি পুনরুদ্ধার এবং উপকূলীয় ও ম্যানগ্রোভ প্রতিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে Treatment, Storage and Disposal Facility (TSDF) প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য শোধন, প্রয়োজনীয় ইনসিনারেটর স্থাপন এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাড়ানো, Testing Lab প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।
জাহাজ নির্মাণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান
অন্য সভায় দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, তুলনামূলক কম শ্রমব্যয়, বিদ্যমান কারিগরি সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনাকে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শিল্পটির সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক ড্রাইডক নির্মাণ, মডুলার শিপ বিল্ডিং প্রযুক্তির ব্যবহার, রপ্তানিমুখী শিপইয়ার্ড গড়ে তোলা, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্ব নৌপরিবহন খাতে দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও সভায় উঠে আসে। এ ক্ষেত্রে কম-কার্বন ও বিকল্প জ্বালানি, LNG, Green Steel, Carbon Trading এবং Smart Shipyard-এর মতো বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে শিল্পকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্ব নৌপরিবহন খাতের ডিকার্বনাইজেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান ও IMO-এর সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
গ্রিন ফাইন্যান্স ও সহজ অর্থায়নের প্রয়োজন
জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ—উভয় খাতের টেকসই বিকাশে অর্থায়নকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। উদ্যোক্তাদের জন্য গ্রিন ফাইন্যান্স, সরকারি গ্যারান্টি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং রপ্তানি ঋণের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থাপন ও আধুনিক অবকাঠামো তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব
সভায় মত দেওয়া হয়, দেশের জাহাজ শিল্পকে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত নীতিগত সুপারিশ প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনায় বলা হয়, সঠিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কর্মকর্তা, নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিল্প উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন অংশীজন অংশ নেন।


