রাখি পূর্ণিমায় ভ্রাতৃত্বের পাশাপাশি দেশপ্রেমের বন্ধনের আহ্বান

রাখি পূর্ণিমায় ভ্রাতৃত্বের পাশাপাশি দেশপ্রেমের বন্ধনের আহ্বান
দেশপ্রেমের বন্ধনের আহ্বান

রাখি পূর্ণিমা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম পরিচিত সাংস্কৃতিক উৎসব। ভাই-বোনের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে বাংলার ইতিহাসে রাখি উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয় চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে সময়ের সঙ্গে রাখি উৎসবের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও বদলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসবকে কেবল সামাজিক সম্প্রীতি কিংবা ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান সামনে এসেছে।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি উৎসবকে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে সময় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে রাখি বাঁধার কর্মসূচি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে রাখি উৎসবকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলেও জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের দিকটিও সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য, জাতীয় প্রতীক এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা দরকার।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রাখি পূর্ণিমাকে ‘দেশপ্রেমের রাখি বন্ধন’ হিসেবে দেখার একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। এর মূল লক্ষ্য হিসেবে বলা হচ্ছে—ভাই-বোনের পারস্পরিক সম্পর্কের পাশাপাশি দেশ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, জাতীয় ঐক্য এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার চেতনাকে আরও দৃঢ় করা।

রবীন্দ্রনাথের রাখি উৎসবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে রাখি উৎসবের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তার উদ্দেশ্য ছিল বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যকে শক্তিশালী করা। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি ঐক্যের একটি প্রতীকী কর্মসূচি গড়ে তুলেছিলেন।

অর্থাৎ বাংলার ইতিহাসে রাখি উৎসবের সঙ্গে সামাজিক বন্ধন, সম্প্রীতি এবং বৃহত্তর জাতীয় চেতনার সম্পর্ক নতুন নয়। বর্তমান সময়ে সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে দেশপ্রেমের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

সনাতন সংস্কৃতিতে রাখির তাৎপর্য

সনাতন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রাখি বা রক্ষাসূত্রের ধারণারও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। রাখি পূর্ণিমা ভাই-বোনের ভালোবাসা ও পারস্পরিক দায়িত্বের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় হলেও এর সঙ্গে রক্ষাবন্ধনের ধর্মীয় ও পৌরাণিক নানা কাহিনি যুক্ত রয়েছে।

মহাভারতের জনপ্রিয় কাহিনিতে বলা হয়, শ্রীকৃষ্ণের হাতে আঘাত লাগলে দ্রৌপদী নিজের বস্ত্রের অংশ ছিঁড়ে তাঁর হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার সঙ্গে পরবর্তীতে কৃষ্ণের পক্ষ থেকে দ্রৌপদীকে রক্ষার প্রতিশ্রুতির কাহিনি লোকপ্রচলিত হয়েছে।

অন্যদিকে পৌরাণিক বর্ণনায় দেবরাজ ইন্দ্রের বিজয় কামনায় তাঁর স্ত্রী শচী বা ইন্দ্রাণীর রক্ষাসূত্র বাঁধার কথাও উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব কাহিনি ভারতীয় সংস্কৃতিতে রক্ষাসূত্রের প্রতীকী গুরুত্বকে তুলে ধরে।

সম্প্রীতি থেকে জাতীয় চেতনা—নতুন ব্যাখ্যা

রাখি উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—সময়ের সঙ্গে এর সামাজিক অর্থের বিস্তার ঘটেছে। কোথাও এটি ভাই-বোনের সম্পর্কের উৎসব, কোথাও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক, আবার কোথাও জাতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেমের বার্তা প্রকাশের মাধ্যম।

তাই রাখি পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে দেশপ্রেমের বার্তা সামনে আনা হলে সেটিকে উৎসবটির একটি নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে জাতীয় পতাকা, দেশের ইতিহাস, স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক দায়িত্বের বিষয়গুলোকে মানুষের কাছে আরও বেশি করে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিধান বা বিশ্বাস সম্পর্কে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের বৈচিত্র্য ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

রাখি পূর্ণিমার মূল বার্তা

রাখি পূর্ণিমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা এবং সুরক্ষার অঙ্গীকার। সেই সঙ্গে বৃহত্তর অর্থে পরিবার, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধও এই উৎসবের বার্তার অংশ হতে পারে।

ভাই-বোনের বন্ধন থেকে সামাজিক ঐক্য, আর সামাজিক ঐক্য থেকে জাতীয় সংহতি—এই ধারায় রাখি পূর্ণিমা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বিস্তৃত অর্থ বহন করতে পারে।

দেশপ্রেমের সঙ্গে সম্প্রীতি ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে রাখি উৎসব কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উৎসব না থেকে ঐক্য, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতীকে পরিণত হতে পারে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।