বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত–চীন–আমেরিকার ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক লড়াই

বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত–চীন–আমেরিকার ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক লড়াই
ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক লড়াই

বাংলাদেশকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। একদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও নিরাপত্তা অংশীদার ভারত, অন্যদিকে অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারকারী চীন। আর বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ঢাকা এখন শুধু দুই প্রতিবেশীর প্রতিযোগিতার মধ্যেই নয়, বৃহত্তর মার্কিন–চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

চীনের নতুন করিডোর, ভারতের উদ্বেগ

২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেইজিং বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব সামনে আনে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এর সম্ভাব্য সুবিধা হলো পরিবহন ব্যয় ও সময় কমানো এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়ানো।

চীনের জন্য এর গুরুত্ব আরও কৌশলগত। বঙ্গোপসাগরে সরাসরি স্থলভিত্তিক সংযোগ পেলে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চল ভারত মহাসাগরের সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত হতে পারে এবং মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

এ কারণেই প্রস্তাবিত করিডোরটি ভারতের বিশেষ নজরে রয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি, সম্ভাব্য চীনা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়, তিস্তা প্রকল্প এবং নতুন অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে।

ভারতের জন্য কেন বাংলাদেশ এত গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বাংলাদেশের তিন দিকের ভূগোলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারতের মূল ভূখণ্ড ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপথ, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এবং সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুনঃ তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে নতুন সমীকরণ, সম্পর্কের বরফ গলাতে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার আলোচনা

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও তাকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের দাবি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে আছে। আগস্ট ২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

অর্থাৎ, ঢাকা একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতে চাইছে না।

তিস্তা হয়ে উঠছে আরেক কৌশলগত ক্ষেত্র

তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা শুধু বাংলাদেশ–ভারত পানি-বণ্টনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে এখন চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও যুক্ত হয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করে আসছে। অন্যদিকে চীন তিস্তা নদী অববাহিকায় বৃহৎ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকারও স্পষ্ট করেছে যে তিস্তা ইস্যুর কারণে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা তারা চায় না।

এখানে বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—তিস্তা উন্নয়ন হবে অর্থনৈতিক ও পানি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন থেকে, নাকি এটি বৃহত্তর ভারত–চীন প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠবে?

যুক্তরাষ্ট্র কোথায়?

ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটনের কাছে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। চীনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক দ্রুত গভীর হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর নিয়ে আলোচনা হয়। সফরটির সময়ও তাৎপর্যপূর্ণ—কারণ এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নেন।

অর্থাৎ ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে চীনের একচেটিয়া প্রভাববলয়ে চলে যেতে দেওয়া কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তিন শক্তির তিনটি স্বার্থ

দেশ বাংলাদেশের প্রতি প্রধান আগ্রহ
🇮🇳 ভারত সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
🇨🇳 চীন বাণিজ্য, অবকাঠামো, বন্দর, করিডোর, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ ও ভারত মহাসাগরীয় সংযোগ
🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা

বাংলাদেশের জন্য সুযোগ কোথায়?

এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য শুধু ঝুঁকি নয়, বড় সুযোগও তৈরি করতে পারে।

যদি ঢাকা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে পারে, তাহলে ভারত থেকে সীমান্ত ও আঞ্চলিক যোগাযোগ, চীন থেকে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা—সবগুলো ক্ষেত্রেই সুবিধা নেওয়া সম্ভব।

চীন ইতোমধ্যে বলেছে, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডোরে ভারতসহ অন্য দেশ চাইলে যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ প্রকল্পটি ভবিষ্যতে শুধু তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে—এমনটা এখনই নিশ্চিত নয়।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া

চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভারতকে উদ্বিগ্ন করতে পারে। ভারতের সঙ্গে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সীমিত করতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও চাপ তৈরি হতে পারে।

তাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো ‘ভারতবিরোধী চীন কার্ড’ বা ‘চীনবিরোধী ভারত কার্ড’ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। বিশ্লেষকরাও বাংলাদেশের জন্য একক কোনো শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

সামনে কী হতে পারে?

বাংলাদেশকে ঘিরে আগামী দিনের প্রতিযোগিতা সম্ভবত সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে না। বরং লড়াই হবে—

বন্দর → করিডোর → রেল ও সড়ক যোগাযোগ → জ্বালানি → তিস্তা → প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম → বাণিজ্য → প্রযুক্তি → বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা।

এ কারণেই বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি ‘কৌশলগত সুইং স্টেট’—যে দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে কতটা ঝুঁকছে, তা ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষেরই হিসাব বদলে দিতে পারে।

শেষ কথা:
বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—কাউকে বেছে নেওয়া নয়, বরং সবাইকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের স্বার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া। চীন যদি অবকাঠামো দেয়, ভারত যদি আঞ্চলিক সংযোগ ও বাজার দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি বাণিজ্য ও প্রযুক্তির সুযোগ বাড়ায়—তাহলে এই ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য চাপের বদলে উন্নয়নের কৌশলগত সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।