তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে নতুন সমীকরণ, সম্পর্কের বরফ গলাতে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার আলোচনা

তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে নতুন সমীকরণ, সম্পর্কের বরফ গলাতে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার আলোচনা
তারেক রহমানের ভারত সফর

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। চলতি আগস্টের ২০ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে সফরটি হতে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও এখনো চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি। দুই দেশের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যে সম্ভাব্য এই সফরকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সফরটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় ভারতের বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের পর। পরে ভারতের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

বুধবার ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানের ভারত সফরকে ‘স্মরণীয়’ করে তুলতে চান। তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে সম্মানজনক অভ্যর্থনা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জন্যও ইতিবাচক ফল আসতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সফরের দিনক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তা

এর আগে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পরে জানানো হয়েছে, সফর নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও সফর সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।

ফলে সম্ভাব্য সফরটি আদৌ আগস্টে হচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত–চীন–আমেরিকার ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক লড়াই

শেখ হাসিনা প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ঢাকার অবস্থান

তারেক রহমানের ভারত সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, অনুরোধটি তাদের আইনি কাঠামোর আওতায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে একটি অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের পদক্ষেপকে ঢাকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দিল্লির বার্তা—সম্পর্কে পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব

অন্যদিকে ভারত বলছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি বাংলাদেশের অনুরোধ অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও নয়াদিল্লি জানিয়েছে।

ভারতের এই অবস্থানের মধ্যেই দেশটির হাইকমিশনারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে সম্মানজনক অভ্যর্থনার বার্তা আসায় কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

সম্ভাব্য সফরে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বাংলাদেশ-ভারত রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন
  • শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ
  • সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা
  • বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা
  • পানি বণ্টন ও তিস্তা ইস্যু
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা
  • আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বন্দর ব্যবহার
  • দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা
  • বিমসটেক ও ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা

বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারম্যান এবং ভারতীয় পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। ফলে ভারত সফর হলে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

সম্পর্কের বরফ গলানোর সুযোগ

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, সীমান্ত পরিস্থিতি, পানি বণ্টন এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকটসহ বিভিন্ন কারণে গত দুই বছরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ভারতের পক্ষ থেকেও সফরকে ইতিবাচকভাবে নেওয়ার বার্তা আসছে। তবে সফরের আগে শেখ হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রত্যাশা এবং ভারতের আইনি ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

সামনে কী?

বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারেক রহমান কি আগস্টেই ভারত সফরে যাচ্ছেন, নাকি সফরটি পিছিয়ে যাবে?

একদিকে দিল্লি সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সফরটিকে স্মরণীয় করতে চান বলে ভারতীয় হাইকমিশনার জানিয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকা স্পষ্ট করেছে, সফরের জন্য অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন।

তাই সম্ভাব্য এই সফর শুধু সৌজন্য সফর হবে, নাকি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে—তা নির্ভর করবে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকে রাজনৈতিক আস্থা, শেখ হাসিনা প্রত্যর্পণ এবং দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের বিষয়গুলো কতটা সমাধানের পথে এগোয় তার ওপর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।