যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে বিশ্ব. যুদ্ধ কখনো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে আটকে থাকে না। একটি ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ হয়তো নির্দিষ্ট কোনো স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া হয়, কিন্তু তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বহু দূর পর্যন্ত। জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়, পণ্যের দাম বাড়ে, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বোঝা এসে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন নিরাপত্তা, প্রতিশোধ কিংবা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের হিসাব-নিকাশে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তখন তার অনিবার্য মানবিক মূল্য বহন করে নিরস্ত্র মানুষ। গতকাল বুধবার একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালেও ক্ষেপণাস্ত্রের শার্পনেলের আঘাতে এক শিশুসহ পাঁচজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা যুদ্ধের ভয়াবহতার নির্মম উদাহরণ।
আরও পড়ুনঃ ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৬ লাখ কোটি টাকা
কোনো সামরিক অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্য নির্দিষ্ট স্থাপনা হলেও বাস্তবে ধ্বংসযজ্ঞ প্রায়ই সেই সীমার মধ্যে থাকে না। একটি হামলা পরবর্তী হামলার কারণ তৈরি করে, প্রতিশোধের জবাব আসে পাল্টা প্রতিশোধে। এভাবে সংঘাত ধীরে ধীরে এমন এক চক্রে প্রবেশ করে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।
যুদ্ধের প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে অর্থনীতিতে
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ে।
তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের দামই বাড়ে না। পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং কৃষি—সব খাতেই এর প্রভাব পড়ে। কৃষিতে সেচের খরচ বাড়ে, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা ব্যয়বহুল হয়, সার ও অন্যান্য উপকরণের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। একই সঙ্গে খাদ্যশস্য পরিবহনের খরচও বাড়তে থাকে।
অর্থাৎ যুদ্ধের গোলা যেখানে পড়ছে, তার বহু দূরের মানুষের জীবনেও সেই যুদ্ধের অভিঘাত পৌঁছে যাচ্ছে। একটি দেশের সংঘাত শেষ পর্যন্ত অন্য দেশের বাজার, পরিবার ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও সংকট তৈরি করতে পারে।
সিদ্ধান্ত নেয় কয়েকজন, মূল্য দেয় কোটি মানুষ
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কোথায়?
বিশ্বে ৮৪০ কোটির বেশি মানুষের বসবাস। অথচ যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক অভিযানের মতো সিদ্ধান্ত সাধারণত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রেই নেওয়া হয়। যাদের সিদ্ধান্তের কারণে কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে, সেই সাধারণ মানুষের মতামত সেখানে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
আরও পড়ুনঃ শান্তির সংস্কৃতি গড়তে ন্যায়বিচার ও নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: আইরিন খান
আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে ক্ষমতার সমীকরণ অনেক সময় মানুষের মৌলিক নিরাপত্তার ওপর প্রাধান্য পায়।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়, অর্থনৈতিক চাপ তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় কিংবা কৌশলগত সুবিধা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের প্রতিফলন যখন বাজারে দেখা দেয়, তখন সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে সমাজের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
একজন সচ্ছল ব্যক্তি জ্বালানি বা নিত্যপণ্যের বাড়তি ব্যয় সামলে নিতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের জন্য একই মূল্যবৃদ্ধি কখনো খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা সন্তানের প্রয়োজনীয় খরচ বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ হতে পারে।
পরিসংখ্যানের আড়ালে হারিয়ে যায় মানুষের জীবন
যুদ্ধের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো মানুষের অনুভূতিতে ধীরে ধীরে এর প্রভাব কমে যাওয়া। দূরদেশের একটি শিশুর মৃত্যু যখন সংবাদে প্রকাশিত একটি সংখ্যা মাত্র হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই মৃত্যুর পেছনে থাকা একটি পরিবারের গল্প আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায়।
নিহত মানুষের সংখ্যা বাড়ে, আহতের সংখ্যা বাড়ে, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একজন মানুষ—যার পরিবার ছিল, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ছিল, স্বপ্ন ছিল।
যুদ্ধের ভয়াবহতা বোঝার জন্য তাই শুধু নিহত বা আহতের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি প্রাণহানির মানবিক মূল্য উপলব্ধি করতে হবে। তাহলেই বোঝা যাবে, যুদ্ধ কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এর প্রতিটি বিস্ফোরণ মানুষের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে।
সমাধান অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় নয়
এই বাস্তবতায় সংঘাতের সমাধান আরও বেশি অস্ত্র, আরও বেশি সামরিক শক্তি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মধ্যে খোঁজা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও জরুরি।
প্রয়োজন সংযম, কার্যকর কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বাস্তবসম্মত ও সমান সম্মান। প্রয়োজন এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দাবি অন্য রাষ্ট্রের নিরস্ত্র মানুষের জীবন ও মৌলিক অধিকারের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে না।
আরও পড়ুনঃ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো সংঘাত শুরু হওয়ার পর শুধু প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়; সংঘাত যাতে বিস্তৃত না হয়, সে জন্য আগেই কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা। কারণ প্রতিটি যুদ্ধের পরিণতি সামরিক বিজয়-পরাজয়ের হিসাবের চেয়ে অনেক বড়।
মানবতার বিজয়ই হোক প্রকৃত বিজয়
পৃথিবী কোনো একক পরাশক্তি বা কয়েকটি ক্ষমতাকেন্দ্রের সম্পত্তি নয়। এটি কোটি কোটি মানুষের অভিন্ন আবাস। কোথাও যুদ্ধ শুরু হলে তার ধাক্কা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য মানুষের জীবনেও পৌঁছায়।
মানচিত্রে দেশের সীমারেখা আছে, কিন্তু মানুষের কান্নার কোনো সীমান্ত নেই। একটি শিশুর মৃত্যু, একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া কিংবা একটি জনপদের ধ্বংস কোনো ভূরাজনৈতিক হিসাবের মধ্যে আটকে থাকে না।
কোনো রাষ্ট্র যুদ্ধের মাধ্যমে সাময়িক কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারে। কিন্তু সেই সাফল্যের বিনিময়ে যদি অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, তাহলে তাকে প্রকৃত বিজয় বলা যায় না।
যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় কোনো পক্ষের পতাকা উড়ানো নয়; প্রকৃত বিজয় হলো এমন একটি পৃথিবী গড়ে তোলা, যেখানে নিরাপত্তার নামে নিরস্ত্র মানুষের জীবন বিসর্জন দিতে হবে না এবং রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান হবে সংলাপ, কূটনীতি ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে।



