দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও ৬ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মার্চ প্রান্তিক শেষে এই অঙ্ক ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
আরও পড়ুনঃ জাতীয় সংসদে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটি গঠন
অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি। হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।
এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চে এর পরিমাণ বেড়েছিল ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
এরপর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকে। ফলে ছয় মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে জমে থাকা অনিয়ম, জালিয়াতি, বেনামি ঋণ ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্র এখন ধীরে ধীরে সামনে আসছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনার মাধ্যমে আগে আড়ালে থাকা সমস্যাগুলো প্রকাশ পাচ্ছে।
প্রকৃত দুর্বলতা এখন প্রকাশ্যে
অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় এবং হিসাব ব্যবস্থাপনার নানা প্রক্রিয়ার কারণে সমস্যাগ্রস্ত অনেক ঋণ প্রকৃত অবস্থায় প্রকাশ পায়নি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুনের মতে, ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই ও পর্যালোচনার ফলে আর্থিক খাতের প্রকৃত দুর্বলতা এখন দৃশ্যমান হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ শান্তির সংস্কৃতি গড়তে ন্যায়বিচার ও নারীর অংশগ্রহণ জরুরি: আইরিন খান
তিনি মনে করেন, অতীতে বিভিন্ন সুবিধার মাধ্যমে যে ঋণগুলোকে সাময়িকভাবে আড়ালে রাখা হয়েছিল, সেগুলো এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কারণে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।
খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ নিয়ে ভিন্নমত
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের সঙ্গে নিয়মিতভাবে সুদ যুক্ত হওয়া এবং দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণ হিসাবের মধ্যে আসার কারণেও মোট খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে।
খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর ফলে সামনে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে এ ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন কয়েকজন ব্যাংকার। তাদের মতে, আগের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন ব্যাংকগুলোর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাঁচ একীভূত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশের বেশি
ব্যাংক খাতের সবচেয়ে সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে একীভূত পাঁচটি ব্যাংক। তীব্র তারল্য সংকট ও ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এসব ব্যাংক বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেছে।
ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম, জালিয়াতি, ভুয়া এলসি এবং বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ অর্ধেকের বেশি
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের পাশাপাশি আরও কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপি বলে তথ্য উঠে এসেছে।
শীর্ষ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ
চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেন।
তালিকায় চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ১১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, সোনালী ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন, চেমন ইস্পাত, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ, কর্ণফুলি ফুডস ও মুরাদ এন্টারপ্রাইজ।
আরও পড়ুনঃ যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে বিশ্ব, মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ
তালিকায় বেক্সিমকো গ্রুপের বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি ও বেক্সিমকো কমিউনিকেশন (আকাশ ডিটিএইচ), কেয়া কসমেটিকস, দেশবন্ধু সুগার মিলস, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম (সিটিসেল), সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি এবং রংধনু বিল্ডার্সের নামও রয়েছে।
১৫ বছরে খেলাপি ঋণের বড় উল্লম্ফন
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের জুনে ওই সরকারের পতনের আগে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা যাচাই এবং বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি ঋণের হিসাবেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়।
পুনঃতফসিল কি স্থায়ী সমাধান?
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদে ছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো সম্ভব হলেও ব্যাংকিং খাতের মৌলিক দুর্বলতা দূর না হলে সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
আরও পড়ুনঃ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের মতে, জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে ব্যবসায়ীরা চাপের মধ্যে রয়েছেন। একই সময়ে নতুন ঋণ বিতরণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে নিম্ন পর্যায়ে। এসব কারণও খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তবে ব্যাংক খাতে সংস্কার, ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের চাপ কমে আসতে পারে বলে আশা করছেন ব্যাংকাররা।




