চীন শীর্ষে, ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র

চীন শীর্ষে, ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র
চীন শীর্ষে, ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র

ভৌগোলিক নৈকট্য ও স্থলপথে যোগাযোগের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের চিত্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে অবস্থান করছে।

গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য হয়েছে প্রায় ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বেড়েছে

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বৃদ্ধির পেছনে আমদানির পরিমাণ বাড়ার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানির মধ্যে গম, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি, সয়াবিন বীজ এবং তুলার মতো পণ্যের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য, জ্বালানি ও তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামালের চাহিদা পূরণে এসব পণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিও প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে।

চীন এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অবস্থানের পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের বাণিজ্যে চীনের শীর্ষ অবস্থান এখনো অটুট রয়েছে।

প্রায় ২২ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর।

ইলেকট্রনিক পণ্য, রাসায়নিক, তৈরি পোশাকশিল্পের সুতা ও কাপড়, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের অন্যান্য কাঁচামালের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ।

উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত চীন

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিল্প বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমেও চীনের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।

ফলে বাংলাদেশের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চীনা পণ্য, কাঁচামাল ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও চীন দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী সরবরাহ-শৃঙ্খল গড়ে তুলেছে। উৎপাদন সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং বিশাল শিল্পভিত্তির কারণে অনেক ক্ষেত্রে চীনের বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বাণিজ্যের পাশাপাশি কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্ব বাণিজ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থানের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ভূরাজনীতি ও কূটনৈতিক বাস্তবতা বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের ওপর প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও কিছু ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।

জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের অবস্থান

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের তালিকায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের পর ইউরোপের দেশগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। জার্মানি বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং যুক্তরাজ্যও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে সেবা খাতের বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও শক্তিশালী। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার, আর চীনও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।

ছোট বাজারকেও গুরুত্ব দেয় বড় অর্থনীতি

বাংলাদেশের বাজার আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর কাছে এটি উপেক্ষা করার মতো নয়। জনসংখ্যা, ভোক্তা চাহিদা, শিল্পায়ন এবং ভবিষ্যৎ বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতিগুলো ছোট ও মাঝারি বাজারগুলোকেও তাদের বৃহত্তর বাণিজ্য ও সরবরাহ কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদে বড় বাজারের পাশাপাশি অসংখ্য ছোট বাজারের সম্মিলিত গুরুত্বও অনেক।

পরাশক্তির শক্তি শুধু চাপ প্রয়োগে নয়

একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি যতই বড় হোক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক টেকসই করতে কূটনৈতিক ভারসাম্য ও বাস্তববাদী নীতির প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কৌশল হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা তাই একটি বিষয় স্পষ্ট করে—পরাশক্তির পরিচয় শুধু তার সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় নয়; বরং সেই শক্তিকে কীভাবে দায়িত্বশীল ও কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।