পৃথিবীতে মানুষের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয় ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু মানুষের মৌলিক শারীরিক গঠন, মানবিক মর্যাদা এবং নিরাপদে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মৌলিক মিল রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে ঘৃণা করা, তার অধিকার অস্বীকার করা কিংবা একটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে যাচাইহীন প্রচারণা চালানো মানবিক সহাবস্থানের পরিপন্থী।
বিশ্বে ধর্মের বৈচিত্র্য যেমন রয়েছে, তেমনি ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও মতাদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান ও জীবনযাপনের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তাই কোনো ধর্মের অনুসারীদের সবাইকে একই রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করানো কিংবা একটি দেশের সরকারের কর্মকাণ্ডের দায় পুরো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।
মদিনা সনদ: সহাবস্থানের ইতিহাস
ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে মদিনার সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর মুসলিম সম্প্রদায় এবং সেখানকার বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক ও পারস্পরিক দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য যে চুক্তি বা দলিলের কথা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়, তা মদিনা সনদ নামে পরিচিত।
এই দলিলে মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়ের সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় পরিচয়সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধানের উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি একটিমাত্র দলিল ছিল, নাকি একাধিক চুক্তি পরবর্তী সময়ে একত্রে সংকলিত হয়েছে—তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাথমিক ইসলামী সমাজে মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদিদেরও উপস্থিতি ছিল। মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে বনু কায়নুকা, বনু নাদির ও বনু কুরাইজা উল্লেখযোগ্য। তারা মক্কার পৌত্তলিক গোত্র ছিল না; বরং মদিনা ও তার আশপাশের ইহুদি সম্প্রদায়ের অংশ ছিল।
পরবর্তী সময়ে এসব গোত্রের সঙ্গে মুসলিম নেতৃত্বের সংঘাত, অবরোধ, বহিষ্কার এবং বনু কুরাইজার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ঘটনা ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে। ঘটনাগুলোর কারণ, বিবরণ ও ব্যাখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। তাই ইতিহাসের একটি অংশ তুলে ধরে অন্য অংশ বাদ দেওয়া কিংবা সব ঘটনাকে একক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।
মদিনা সনদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য কোনো ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট প্রমাণ করা নয়। বরং ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে চুক্তি, দায়িত্ব ও সহাবস্থানের ধারণা কীভাবে গড়ে উঠেছিল, তা বোঝা।
ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম: ইতিহাসের জটিল সম্পর্ক
ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামকে সাধারণভাবে আব্রাহামীয় ধর্ম বলা হয়। তিনটি ধর্মের মধ্যেই আব্রাহাম বা ইব্রাহিমের ঐতিহ্যের গুরুত্ব রয়েছে। তবে তাদের ধর্মতত্ত্ব, ধর্মীয় বিধান ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এক নয়।
মধ্যযুগে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদিরা নিপীড়ন, বহিষ্কার ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে মুসলিম শাসিত বিভিন্ন অঞ্চলে কোনো কোনো সময়ে ইহুদি সম্প্রদায় ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। আবার এসব সমাজেও বিভিন্ন সময়ে বৈষম্য ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
আধুনিক ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের পেছনে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ভূমি, জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তা, সামরিক দখল ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত বহু জটিল বিষয় রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় এবং তার পরবর্তী যুদ্ধের ফলে বহু ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। একই সঙ্গে অঞ্চলটির বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ তৈরি হয়।
এই সংঘাতকে শুধু মুসলিম বনাম ইহুদি হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক জটিলতা আড়ালে থেকে যায়। ইহুদি পরিচয়, ইসরায়েল রাষ্ট্রের নীতি এবং জায়নবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শও এক বিষয় নয়। একইভাবে মুসলিম পরিচয় এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশের সরকারের নীতিও এক নয়।
ইসরায়েলের মুসলিম নাগরিকদের বাস্তবতা
ইসরায়েলের নাগরিকদের মধ্যে আরব মুসলিমরাও রয়েছেন। তাঁরা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন, রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারেন এবং সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শরিয়াভিত্তিক পারিবারিক আইন পরিচালনার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে এসব অধিকারের অস্তিত্বকে ইসরায়েলের সব মুসলিম নাগরিক সর্বক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সমতা ভোগ করেন—এমন প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নাগরিক অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, ভূমি, আবাসন, সরকারি পরিষেবা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে হলে অধিকার এবং সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই বিবেচনা করতে হবে।
একইভাবে ইসরায়েলের মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে কেউ দেশটিতে বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কেউ সরকারের নীতির সমালোচনা করেন। তাঁদের সবাই একই রকম চিন্তা করেন বা একই রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন—এমন ধারণারও ভিত্তি নেই।
কোনো দেশের নাগরিকদের একটি অংশ সেখানে বসবাস করছেন বলেই ওই দেশের সব নীতি ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। আবার কোনো রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করার জন্য সেই রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে শত্রু ভাবারও প্রয়োজন নেই।
ইসরায়েলের নির্বাচন ও আরব মুসলিম ভোটের গুরুত্ব
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর ভূমিকা এবং মুসলিম ভোটারদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সংসদ নেসেটে মোট ১২০টি আসন রয়েছে। সাধারণভাবে সরকার গঠনের জন্য ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে জোট গঠন ও বিভিন্ন দলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০২১ সালে মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন আরব ইসলামপন্থী দল রা’আম নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের জোট সরকারে অংশ নিয়েছিল। ঘটনাটি দেখায়, ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর সমর্থন কখনো কখনো সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনের পর প্রাথমিক ফলাফল ও বিভিন্ন পূর্বাভাসে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে সরকার গঠনের প্রশ্নে জোট আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতা বিবেচনা না করে কোনো নেতার বিজয় নিশ্চিত বলে ঘোষণা করা ঠিক নয়।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে হলে নির্বাচনী ফলাফল, জনমত জরিপ, ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং সরকার গঠনের বাস্তব পরিস্থিতি দেখতে হবে। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা বিদেশি কোনো নেতার সমর্থন দিয়ে একটি দেশের নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করা যায় না।
উন্নয়ন, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা
ইসরায়েলের অর্থনীতি, প্রযুক্তি খাত, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং স্টার্টআপ উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করতে হলে মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি সামরিক ব্যয়, বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ ও ইসরায়েলের অর্থনীতির আকার তুলনা করার সময় একই বছরের তথ্য এবং একই ধরনের পরিমাপ ব্যবহার করা জরুরি। শুধু মোট জিডিপি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে কোনো দেশের মানুষের সামগ্রিক জীবনমান নির্ধারণ করা যায় না।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতির কাঠামো, রপ্তানি খাত, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ইসরায়েলের তুলনায় আলাদা। এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।
কোনো দেশ উন্নত হলে তার ভালো উদ্যোগগুলো বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। কিন্তু একটি দেশের সাফল্যকে অন্য দেশের মানুষকে অপমান করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে তা উন্নয়নের বাস্তব আলোচনা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, কেন শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, কেন গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং কেন আইনের শাসন, জবাবদিহি ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার দায়িত্ব বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের।
ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, মানবিক মর্যাদাই হোক মূলনীতি
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যায়। একইভাবে তাঁর কোনো নীতি বা উদ্যোগের প্রশংসা করাও সম্ভব। কিন্তু তাঁর ইহুদি পরিচয়ের কারণে তাঁকে ঘৃণা করা কিংবা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত না হলেই কাউকে কোনো ধর্মের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসংগত নয়।
একই নীতি মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও অন্য সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ধর্মীয় পরিচয় কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৎ বা অসৎ, ন্যায়পরায়ণ বা অন্যায়কারী কিংবা যোগ্য বা অযোগ্য করে তোলে না। ব্যক্তির কাজ, নীতি, আচরণ ও দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতেই তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের উন্নয়ন চাইলে আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, গণতন্ত্র, সংবিধান, আইনের শাসন এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, ইসরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং অঞ্চলের সব মানুষের মানবিক মর্যাদার প্রশ্নেও ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়া সম্ভব।
অন্য দেশের সাফল্য থেকে শিক্ষা নেওয়া মানে নিজের দেশকে ছোট করা নয়। বরং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কীভাবে তা পূরণ করা যায় এবং কীভাবে মানুষের জীবনমান উন্নত করা যায়—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই দায়িত্বশীল নাগরিকতার পরিচয়।
ধর্মের পরিচয় নয়, মানুষের কাজ; বিদ্বেষ নয়, যুক্তি; প্রোপাগান্ডা নয়, তথ্য; আর পরনিন্দা নয়, নিজের দেশের উন্নয়ন—এই হোক আমাদের চিন্তা ও কর্মের ভিত্তি।





