১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় দায় কি বিদেশি শক্তির, নাকি আমাদের নিজেদের? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও এর মুখোমুখি হওয়া জরুরি। কারণ, দেশের সম্পদ লুটপাট, সরকারি অর্থের অপচয়, ঘুষ, টেন্ডারবাজি, অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তাঁদের বড় একটি অংশ আমাদেরই সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মানুষ।
ব্রিটেন, পাকিস্তান কিংবা ভারতকে সব সমস্যার জন্য দায়ী করে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্বাধীন দেশের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব স্বাধীন দেশের নাগরিক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা থাকলে তার জবাবদিহিও আমাদের নিজেদের নিশ্চিত করতে হবে।
তবে ইতিহাসকে সরলীকরণ করাও ঠিক হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, পাকিস্তান আমলের বৈষম্য, স্বাধীনতাযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গড়ে ওঠা দুর্নীতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি। এসব কারণকে বিবেচনায় নিয়েই সমস্যার প্রকৃত চিত্র বুঝতে হবে।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও পাকিস্তান আমলের বৈষম্য
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ভারতীয় উপমহাদেশে এমন একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো রেখে যায়, যার বড় অংশের লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব বজায় রাখা এবং সম্পদ আহরণ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সেই কাঠামোর বিভিন্ন উপাদান নতুন রাষ্ট্রগুলোর প্রশাসনে বহাল থাকে।
এরপর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধীনে পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সরকারি বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং অর্থনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন বৈষম্যের অভিযোগের মুখোমুখি হয়। পূর্ব বাংলার পাট রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা এবং উন্নয়ন বরাদ্দের বণ্টন নিয়ে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ ছিল তীব্র।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং সীমিত প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়।
কিন্তু ইতিহাসের এই বাস্তবতা স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও দুর্নীতি ও অপশাসনের অজুহাত হতে পারে না। অতীতের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার দায়িত্ব বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। যে রাষ্ট্রের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করাও স্বাধীনতার চেতনার অংশ।
বৈশ্বিক ব্যবস্থার দায় আছে, কিন্তু দেশীয় দুর্নীতির দায়ও এড়ানো যায় না
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বৈদেশিক ঋণের শর্ত, অসম বাণিজ্য সম্পর্ক এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব সম্পর্ক অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়াতে পারে, নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
কিন্তু বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা শক্তির প্রভাব তখনই বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়, যখন দেশের ভেতরে জবাবদিহির ঘাটতি থাকে এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত স্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পান।
অর্থ পাচারের সঙ্গে দেশীয় রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা প্রশাসনিক গোষ্ঠীর কেউ জড়িত থাকলে শুধু বিদেশি গন্তব্যকে দায়ী করে লাভ নেই। একইভাবে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান ঘুষ, অনিয়ম বা অবৈধ সুবিধা আদায়ে যুক্ত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
অতএব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই হতে হবে দ্বিমুখী—দেশের ভেতরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবৈধ অর্থ পাচার, কর ফাঁকি ও দুর্নীতির সহযোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াও উন্নয়ন সম্ভব: অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের সামনে প্রায়ই মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। এসব দেশের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু ভূগর্ভস্থ তেল-গ্যাস বা প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য দিয়ে কোনো দেশের সমৃদ্ধি নির্ধারিত হয় না। মানবসম্পদ, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, রপ্তানি, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পার্ক চুং হির শাসনামলে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হলেও সেই সময়ের কর্তৃত্ববাদ, শ্রমিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাও ইতিহাসের অংশ। তাই উন্নয়নের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু কর্তৃত্ববাদকে উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখা যাবে না।
তাইওয়ানে ভূমি সংস্কার, শিক্ষা, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন অর্থনৈতিক রূপান্তরে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ ও রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ দেশটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
মালয়েশিয়া বিদেশি বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধির মাধ্যমে এগিয়েছে। মাহাথির মোহাম্মদের শাসনামলে দ্রুত উন্নয়নের পাশাপাশি জাতিগত নীতির প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
ভিয়েতনাম দোই মোই সংস্কারের মাধ্যমে বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। কৃষি উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী শিল্প, শিক্ষা ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় অংশগ্রহণ দেশটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সেখানেও দুর্নীতি ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতার একটি সাধারণ শিক্ষা হলো—দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা, দক্ষ জনশক্তি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সমস্যার একটি বড় অংশ হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সব সময় জনস্বার্থের অধীন রাখা যায়নি। কোথাও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, কোথাও দলীয় প্রভাব, কোথাও ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং কোথাও দুর্বল জবাবদিহি উন্নয়নের সুফলকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং জনগণের সেবা করার দায়িত্ব।
আত্মপরিবর্তনের শিক্ষা: ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নাগরিক দায়িত্ব
পবিত্র কোরআনের সূরা আর-রাদের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।
এই আয়াতের শিক্ষা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে আত্মসমালোচনা, দায়িত্ববোধ এবং পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরে। দুর্নীতি, প্রতারণা, অন্যের অধিকার হরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ না করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
তবে এই শিক্ষার অর্থ এই নয় যে, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু ব্যক্তিগতভাবে ভালো থাকলেই রাষ্ট্রের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ব্যক্তিগত সততার পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারও অপরিহার্য।
একজন নাগরিক ঘুষ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একজন ব্যবসায়ী কর ফাঁকি না দেওয়ার অঙ্গীকার করতে পারেন। একজন অভিভাবক সন্তানকে সততা শেখাতে পারেন। কিন্তু সরকারি সেবা পেতে যদি মানুষকে নিয়মিত ঘুষের মুখোমুখি হতে হয়, কিংবা অপরাধী ক্ষমতার কারণে বিচার এড়িয়ে যেতে পারেন, তাহলে ব্যক্তিগত নৈতিকতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও প্রয়োজন।
সুতরাং আত্মশুদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অন্যের পরিপূরক।
বাংলাদেশের প্রকৃত সংকট কোথায়?
বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে কয়েকটি মৌলিক সমস্যা বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
প্রথমত, দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাব। সরকারি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সরকারি অর্থের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, আইনের অসম প্রয়োগ। অপরাধের বিচার রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা। স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। নির্বাচন, বিচার, দুর্নীতি দমন এবং সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়; বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা, উদ্ভাবন, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পঞ্চমত, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সুযোগের অসমতা। সম্পদ ও সুযোগ সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হলে সামাজিক অসন্তোষ বাড়ে। মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায্য কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
পরিবর্তনের জন্য কী করতে হবে?
বাংলাদেশের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ব্যক্তিগত সততা, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
১. দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা: দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব কমাতে হবে। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোন না কেন, সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
৩. নির্বাচন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কার: অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন, নির্বাচনী ব্যয় এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন।
৪. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্যের অধিকার এবং দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হবে প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা, কোনো পক্ষের প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠা নয়।
৫. সরকারি ক্রয় ও প্রকল্পে স্বচ্ছতা: দরপত্র, প্রকল্প ব্যয়, চুক্তি, বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও নিরীক্ষার তথ্য সহজে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বাধীন নিরীক্ষা ও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির সুযোগ থাকতে হবে।
৬. শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগ: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
৭. অর্থ পাচার রোধ: অবৈধ অর্থের উৎস শনাক্ত, সন্দেহজনক লেনদেন তদন্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
৮. ব্যক্তিগত ও সামাজিক নৈতিকতা: ঘুষ না দেওয়া, ঘুষ না নেওয়া, কর পরিশোধ, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং দুর্নীতিবাজকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় না দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
৯. আয়ের সুযোগ ও সামাজিক নিরাপত্তা: কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. নাগরিক অংশগ্রহণ: স্থানীয় পর্যায়ে বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি সেবা এবং জনপ্রতিনিধিদের কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত জনআলোচনা ও সামাজিক নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
হতাশা নয়, প্রয়োজন সংগঠিত পরিবর্তন
বাংলাদেশের সব অর্জন অস্বীকার করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাকে আড়াল করাও দেশপ্রেমের পরিচয় নয়। দেশকে ভালোবাসার অর্থ হলো দেশের সমস্যা স্বীকার করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং সমাধানের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
আলোচনা, বিতর্ক, প্রশ্ন এবং সমালোচনা গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য অংশ। তবে সমালোচনা যেন কেবল হতাশা ছড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণ, প্রতিটি সমস্যার সঙ্গে সম্ভাব্য সমাধান এবং প্রতিটি দাবির সঙ্গে বাস্তবায়নের পথও সামনে আনতে হবে।
পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। কিন্তু পরিকল্পিত, সংগঠিত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ছাড়া পরিবর্তন সম্ভবও নয়। নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন—সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের সম্পদ রক্ষা ও উন্নয়নের দায়িত্ব কোনো বিদেশি শক্তি এসে পালন করবে না। দেশের মানুষকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে। তবে এই দায়িত্ব পালনের অর্থ শুধু নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা নয়; এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিও তোলা, যেখানে সততার মূল্য থাকবে, দুর্নীতির শাস্তি হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।
পা মাটিতে নামাতে হবে, বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে; কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে কেবল বিলাপ করলে চলবে না—সামনের দিকে হাঁটতে হবে।
আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সমন্বয়েই বাংলাদেশকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করার পথ তৈরি হতে পারে।
দেশকে ভালোবাসা মানে শুধু প্রশংসা করা নয়; সত্য বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং পরিবর্তনের কাজে অংশ নেওয়া। প্রকৃত দেশপ্রেমের পরীক্ষা সেখানেই।





