‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে নানা আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, পঞ্চাশের দশকে আরব ও মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ যখন জোরালো হচ্ছিল, তখন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৫ সালের ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ প্রসঙ্গে বলেছিলেন—“Zero + Zero + Zero = Zero”। অর্থাৎ, একাধিক দুর্বল রাষ্ট্রকে একত্র করলেই তাদের সম্মিলিত শক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় শক্তিতে পরিণত হয় না। সোহরাওয়ার্দীর এই যুক্তিই পরবর্তীকালে ‘শূন্যতত্ত্ব’ হিসেবে আলোচিত হয়।
সোহরাওয়ার্দীর বক্তব্যের মূলকথা ছিল, অনেকগুলো ‘শূন্য’ পাশাপাশি বসালেও তার মূল্য শূন্যই থাকে। কিন্তু সেই শূন্যগুলোর সামনে যদি একটি ‘১’ বসানো যায়, তখনই তৈরি হয় একটি বড় সংখ্যা। তাঁর দৃষ্টিতে সেই ‘১’ ছিল যুক্তরাষ্ট্র—যার সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একটি দুর্বল জোটকে কার্যকর শক্তিতে রূপ দিতে পারত। অবশ্য সে সময় মুসলিম বিশ্বের হাতে আজকের মতো তেলসম্পদকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতা কিংবা পারমাণবিক শক্তি ছিল না।
আজকের বিশ্ব অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। যুদ্ধের চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোনোমাস উইপন সিস্টেম, মানববিহীন যুদ্ধযান, রোবোটিক্স, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার সক্ষমতা এবং ডেটা-নির্ভর কমান্ড সিস্টেম ভবিষ্যতের যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই কেন্দ্র। সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির একটি বড় অংশই দুই দেশ প্রকাশ্যে আনে না। ফলে তাদের প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে বাইরের বিশ্বের ধারণা অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আধুনিক সামরিক শক্তি এখন আর শুধু কতজন সৈন্য, কতটি ট্যাংক বা কতটি যুদ্ধবিমান রয়েছে—তার ওপর নির্ভরশীল নয়। একটি দেশের সামরিক সক্ষমতা নির্ধারণে চিপ ডিজাইন ও উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, সেন্সর প্রযুক্তি, সাইবার সক্ষমতা এবং উন্নত প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর ব্যবধান স্পষ্ট। বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট, উন্নত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব চিপ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো, স্যাটেলাইট সক্ষমতা এবং বিশাল গবেষণা বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে এই দুই পরাশক্তি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফ্রন্টিয়ার-টেকনোলজি ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলেছে। এই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামগ্রিকভাবে এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করা হয়।
ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হতে পারে। এসব যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা শুধু গতি, পাল্লা বা স্টিলথ প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সেন্সর ফিউশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত ডেটা-লিংক, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধব্যবস্থার সঙ্গে এগুলোকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ‘লয়াল উইংম্যান’ নামে পরিচিত স্বয়ংক্রিয় বা আধা-স্বয়ংক্রিয় ড্রোন। একটি উন্নত যুদ্ধবিমান একা লড়াই করার পরিবর্তে একাধিক মানববিহীন প্ল্যাটফর্মকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে পারলে যুদ্ধের প্রচলিত ধারণাই বদলে যেতে পারে। ফলে চতুর্থ বা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেবল নিজস্ব অস্ত্র ও সেন্সরের ওপর নির্ভর করে এমন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ক্রমেই অসুবিধায় পড়তে পারে।
এখানেই সামরিক জোটের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের সংঘাত তৈরি হয়। একটি জোটে অনেকগুলো দেশ থাকলেই সেটি শক্তিশালী সামরিক জোটে পরিণত হয় না। তাদের মধ্যে প্রযুক্তি ভাগাভাগি, যৌথ গবেষণা, সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, সাইবার সক্ষমতা, স্যাটেলাইট ব্যবস্থা এবং আন্তঃসংযুক্ত অস্ত্রব্যবস্থা না থাকলে সংখ্যাগত শক্তি অনেকাংশেই অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।
রাশিয়াও এই প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি হলেও উচ্চপ্রযুক্তির সামরিক গবেষণা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে তার ব্যবধান রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের উল্লেখযোগ্য সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেও ইউরোপ এখনো একটি একক, সমন্বিত সামরিক-প্রযুক্তি শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি।
অন্যদিকে, ইসরায়েল তুলনামূলকভাবে ছোট রাষ্ট্র হলেও সামরিক প্রযুক্তিতে তার অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি নিজস্ব গবেষণা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, সাইবার প্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং উন্নত কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থার কারণে দেশটি সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ নির্ভর করে প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের দ্রুত ব্যবহারের ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও বিশ্লেষণ, উন্নত সেন্সর, স্যাটেলাইট তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাইবার সক্ষমতার সমন্বয় তাদের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিকে অন্য অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় আলাদা করেছে। ‘গসপেল’ ও ‘ল্যাভেন্ডার’ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিতর্ক যেমন AI-নির্ভর লক্ষ্য নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে এনেছে, তেমনি ‘আইরন ডোম’ ও ইউনিট ৮২০০ ইসরায়েলের প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কাঠামোর সক্ষমতার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।
তাই ‘মক্কা চুক্তি’র মতো কোনো আঞ্চলিক সামরিক সমঝোতার কার্যকারিতা বিচার করতে শুধু সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্মিলিত সেনাবাহিনী, অস্ত্রভাণ্ডার কিংবা জনবল হিসাব করলেই হবে না। প্রশ্ন হবে—এই দেশগুলো কি একটি সমন্বিত প্রযুক্তিগত ও সামরিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারবে? তারা কি AI, ড্রোন, রোবোটিক্স, সাইবার যুদ্ধ, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং উন্নত প্রতিরক্ষা গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারবে?
মক্কা চুক্তির তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য হয়তো পারস্পরিক নিরাপত্তা, প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রদর্শন এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর সাফল্য নির্ভর করবে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নয়—প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপরও।
কারণ একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক শক্তির সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধে হয়তো একটি দেশের শক্তি নির্ধারণ করবে না তার কতজন সৈন্য আছে; বরং নির্ধারণ করবে তার কাছে কত উন্নত AI, কত শক্তিশালী ডেটা অবকাঠামো, কত কার্যকর স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, কত উন্নত চিপ ও সেন্সর প্রযুক্তি এবং কত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
সেই অর্থে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ‘Zero + Zero + Zero = Zero’ তত্ত্ব আজও নতুন অর্থে প্রাসঙ্গিক। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই ‘১’ শুধু কোনো একটি পরাশক্তি নয়—বরং প্রযুক্তি, অর্থনীতি, গবেষণা, তথ্য ও সামরিক সক্ষমতার সমন্বিত শক্তি।
মক্কা চুক্তির দেশগুলো যদি সেই ‘১’ তৈরি করতে না পারে, তাহলে বহু রাষ্ট্রের সম্মিলিত সামরিক শক্তিও শেষ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দীর ভাষায় ‘শূন্যের সঙ্গে শূন্য যোগের’ সমীকরণেই আটকে থাকতে পারে।




