বাংলাদেশের পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাংলাদেশের পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
বাংলাদেশের পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাংলাদেশের পাঁচটি সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অগ্রাধিকার খাতগুলো হলো মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প। এসব খাতে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

টোকিওতে স্থানীয় সময় বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা (জেট্রো) হলে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

তারেক রহমান বলেন, ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

বাংলাদেশ-জাপান বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে দেশটিতে জাপানের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নিচে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি ডলার। একই সময়ে জাপান থেকে বাংলাদেশ ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর মধ্যে জাপান ছিল অন্যতম। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে অবদান রেখে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁদের ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের বিষয়টি সামনে রেখে দুই দেশকে পরিকল্পনা করতে হবে।

ইপিএ চুক্তিতে বাণিজ্যের নতুন সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের এ ধরনের প্রথম চুক্তি হিসেবে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে।

তারেক রহমান বলেন, ১৮ কোটির বেশি মানুষের বাজার, প্রায় ২৭ বছর মধ্যম বয়সের তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক শক্তি। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটিতে পরিণত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মোটরযান উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ

পাঁচ অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে মোটরযান উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, চলতি মাসের শুরুর দিকে টয়োটা বাংলাদেশে একটি যানবাহন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে কারখানাটিতে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্যোগে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

জ্বালানি খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনায় জাপানি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। এ খাতে জাপানের জেরা (JERA)-এর সঙ্গেও বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

প্রযুক্তি, মহাকাশ ও রেল যোগাযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনা

প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতার বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সরকার। সেখানে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্রিক উদ্ভাবনভিত্তিক প্রযুক্তি পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশের মহাকাশবিষয়ক সক্ষমতা বাড়াতে মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের।

এ জন্য জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ, রুট নির্ধারণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা চান তিনি।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সুযোগ

বাংলাদেশের কৃষি খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে নানা ধরনের ফসল, ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। এসব কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করলে নতুন শিল্প গড়ে তোলা এবং উৎপাদনশিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তুলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ সমাধানে সরকারের উদ্যোগ

বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানি কোম্পানিগুলোর উত্থাপিত সমস্যাগুলোর কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, কার্যকর অবকাঠামো এবং শুল্ক ছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ সম্পর্কে সরকার অবগত এবং এসব সমস্যার সমাধানে কাজ করছে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা প্রয়োজন, আর বিনিয়োগের জন্য আস্থা অপরিহার্য। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব।

জাপানি ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব

দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য জাপানে যান। পরে দেশে ফিরে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান তাঁরা।

বাংলাদেশি তরুণদের জাপানি ভাষায় দক্ষ করে তোলাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি লাখ লাখ তরুণকে জাপানি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানি ভাষায় দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীরা দুই দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান পাশে ছিল। এখন বাংলাদেশের শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা, নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি এবং যৌথভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে জাপানি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তরের আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে ব্যবসায়ী নেতাদের অংশগ্রহণ

বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় জেট্রো ও জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নিয়ে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিনজি ওয়াকায়ামা। এ সময় সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সহজ করতে গৃহীত সংস্কার ও নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।

মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি (এশিয়া প্যাসিফিক) প্রাইভেট লিমিটেডের ঢাকা শাখার শাখা মহাব্যবস্থাপক ও কান্ট্রি চেয়ারপারসন কেনিচিরো কাওয়ামোতো ‘টুগেদার ফর আ ব্রাইটার বাংলাদেশ’ শীর্ষক উপস্থাপনা দেন। ওয়াইকেকে করপোরেশনের গ্লোবাল সেলস হেডকোয়ার্টার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাত নিয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।