নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। তবে কীভাবে এই সরকার গঠন করা হবে, এর ক্ষমতা ও কার্যপরিধি কতটুকু হবে এবং মেয়াদ কত দিন থাকবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি, কাঠামো ও ক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে কমিটি। এ বিষয়ে এমন একটি ব্যবস্থা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে, যাতে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর কত দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে, কীভাবে এর সদস্য নির্বাচন করা হবে এবং সরকারটির সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা কী হবে—এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সরকার গঠনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন কিংবা নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি পরিচালনার মতো সম্ভাব্য পদ্ধতিগুলো নিয়েও আলোচনা চলছে। সব প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হলে বিতর্কের মাধ্যমে আরও নতুন মতামত ও প্রস্তাব আসতে পারে বলে জানান তিনি।
তাঁর মতে, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার জন্য এমন একটি কাঠামো তৈরি করা জরুরি, যা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করবে।
জুলাই সনদের প্রস্তাবও পর্যালোচনা করছে কমিটি
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত জুলাই সনদের বিভিন্ন ধারা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। সনদে থাকা প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বৈঠকে র্যাঙ্কড চয়েস ভোট পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হলেও এ বিষয়ে কমিটির পক্ষ থেকে ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্যদের অভিমত, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া আলোচনা ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নতুন কোনো প্রস্তাব এলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
সংবিধান সংশোধনে বিভিন্ন মহলের মতামত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধন নিয়ে সুশীল সমাজ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রস্তাব পাওয়া গেছে।
এসব প্রস্তাব একত্র করে বিশেষ কমিটির পরবর্তী বৈঠকগুলোতে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হবে। সব বিষয় এখনো পর্যালোচনাধীন থাকায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।
গুমের শিকার পরিবারের অভিজ্ঞতা শুনল বিশেষ কমিটি
বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনেন কমিটির সদস্যরা। এ সময় সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুমাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও মোছা. তাহসিনা রুশদী তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তাঁরা অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতন, দীর্ঘদিন আইনি সুরক্ষা না পাওয়া এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান। স্বাধীন বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য সংবিধানে কার্যকর ও শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার ওপর তাঁরা গুরুত্ব দেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আরও পর্যালোচনা
সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি, গঠনপ্রক্রিয়া, মেয়াদ ও ক্ষমতার পরিধি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতামত যাচাই করে একটি সর্বজনগ্রাহ্য কাঠামো তৈরিই বিশেষ কমিটির লক্ষ্য। এর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্ক কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।





