দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন এবং শিক্ষার মান বাড়াতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ. জেড. এম. জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব। শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—কোনো একটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না থেকে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আজ ময়মনসিংহ নগরীর টাউন হল অডিটোরিয়ামে জেলা শিক্ষক সমিতির ত্রিবার্ষিক সম্মেলন ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, অতীতে অনেক গুণী শিক্ষককে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন দেখেছেন তিনি। তবে এবারের অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের দায়িত্বশীল আচরণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর মতে, এ ধরনের আচরণ শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক ও গুণগত পরিবর্তনের পরিচয় বহন করে।
পাঠ্যবইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. এ. জেড. এম. জাহিদ হোসেন বলেন, বইয়ের কাজ মানুষের ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া নয়, বরং ইতিহাসকে ধারণ করতে শেখানো। অতীতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬২ ও ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর তাৎপর্য বুঝতে হবে। একই সঙ্গে ১৯৭৫, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটও জানতে হবে। এসব ইতিহাসের সমন্বয়েই বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসে। তবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবের অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, দেশে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, কিন্ডারগার্টেন ও প্রি-ক্যাডেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কেন প্রত্যাশিত শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে ভাবতে হবে। শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারার কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয়করণসহ বিভিন্ন দাবি প্রসঙ্গে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে সরকার একমত এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁদের নিয়ে ভাবছেন। তবে শিক্ষকদের কেবল সরকারিকরণ, এমপিওভুক্তি বা জাতীয়করণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে আরও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সরকার। শহর থেকে গ্রাম, ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড—সব জায়গায় শিক্ষকরা যেন সবচেয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে থাকেন, সেটিই সরকারের প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান দেওয়া জাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সমাজে তাঁদের অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের কাছেও জাতির প্রত্যাশা অনেক। তাঁরা শুধু জাতির মেরুদণ্ড নন, আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলার কারিগর।
সমাজ পরিবর্তনেও শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষকরা সঠিক পরামর্শ দিলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিশেষ করে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে শিক্ষকরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। এ সামাজিক ব্যাধি দূর করতে সচেতনতা তৈরিতে তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে।
ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও শিক্ষক নেতা অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান সেলিম ভূইয়া। বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব জাকির হোসেন।
জেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোখলেছুর রহমান বকুল ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব আব্দুস সাত্তার ভূইয়া যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভালুকা আসনের সংসদ সদস্য ফখরুদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চু, গফরগাঁও আসনের সংসদ সদস্য আকতারুজ্জামান বাচ্চু, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক এ. কে. এম. শফিকুল ইসলামসহ বিএনপি ও শিক্ষক সংগঠনের নেতারা।
শিক্ষকদের জাতীয়করণ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য সেলিম ভূইয়া বলেন, শিক্ষকদের আর্থিক কষ্টে রেখে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ উপলব্ধি থেকেই প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া তাঁদের দল ক্ষমতায় গেলে বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের দাবিগুলো বিবেচনা করে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক বদলি প্রসঙ্গে সেলিম ভূইয়া অভিযোগ করেন, মন্ত্রণালয়ে থাকা ফ্যাসিস্টরা বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে তামাশা করছে এবং সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলেও তিনি আশা জানান।
অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহ জেলার ১৪টি উপজেলার কয়েক হাজার শিক্ষক অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত শিক্ষকরা জাতীয়করণের দাবিতে স্লোগান দিয়ে প্রধান অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।





