ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা, শক্তিশালী ডানপন্থী জোটের আহ্বান নেতানিয়াহুর

ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা, শক্তিশালী ডানপন্থী জোটের আহ্বান নেতানিয়াহুর
ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন তিনি। তবে ভোট-পরবর্তী জরিপে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশিত বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের এক্সিট পোল বা ভোট-পরবর্তী জরিপে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের চিত্র উঠে আসে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে প্রকাশিত হালনাগাদ জরিপে নেতানিয়াহুর জোট কিছুটা এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ও সরকার গঠনের সমীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ডানপন্থী সরকার গঠনে জোর নেতানিয়াহুর

জেরুজালেমে লিকুদ পার্টির নির্বাচনী সদর দপ্তরে সমর্থক ও দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইসরায়েলের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল লিকুদ। ইহুদি রাষ্ট্রের সমর্থকদের মধ্যে ডানপন্থীদের শক্ত অবস্থান রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের অবশ্যই একটি শক্তিশালী, ডানপন্থী, জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে।”

আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনার বিরোধিতা করে তিনি অভিযোগ করেন, এসব দলের কয়েকটি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় আদর্শের বিরোধিতা করে। এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল সরকার দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান সম্পর্কে নেতানিয়াহুর অভিযোগগুলো তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচ্য; সংশ্লিষ্ট দলগুলোর অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এক্সিট পোলে এগিয়ে-পিছিয়ে দুই শিবির

ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু নির্বাচনের পরপর প্রকাশিত জরিপে কোনো জোটই সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি।

‘কান’ ও ‘চ্যানেল ১৩’-এর প্রাথমিক জরিপে নেতানিয়াহুর জোট এবং চার দলের বিরোধী শিবির—উভয়েরই ৫১টি করে আসন পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ধরা হয় ১৮টি।

‘চ্যানেল ১২’-এর জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের জন্য ৫২টি, বিরোধী শিবিরের জন্য ৪৯টি এবং আরব দলগুলোর জন্য ১৯টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

বুধবার সকালে হালনাগাদ কিছু জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা আরও বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে বলেও জরিপগুলোতে আভাস দেওয়া হয়েছে। তবে এক্সিট পোল চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফল নয়।

সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট ও টাইমস অব ইসরায়েল।

ইরানের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজের প্রত্যাশা

বক্তব্যে নেতানিয়াহু তাঁর সরকারের সামরিক অর্জনের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ইরান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে এবং ইসরায়েল সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করে ইরানের হুমকি মোকাবিলার একটি সুযোগ রয়েছে। তবে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত থাকবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যে নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণই এখন ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সরকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ

বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও বিতর্ক চলছে। নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন গ্রহণের প্রশ্ন সরকার গঠনের আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে।

লিকুদ পার্টির সংসদ সদস্য অমিত হালেভি দাবি করেন, প্রাথমিক জরিপে ডানপন্থী জোটের সমর্থন পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। তাঁর মতে, ভোটারদের অংশগ্রহণ ও নির্বাচনী ফলাফলের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সামনে এলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।

তিনি আরও বলেন, আরব দলগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তাঁর আপত্তি জাতিগত পরিচয়ের কারণে নয়; বরং সংশ্লিষ্ট দলগুলোর আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁর উদ্বেগ রয়েছে।

সমর্থকদের প্রত্যাশা—দেশে ঐক্য প্রতিষ্ঠা

নির্বাচনী সদর দপ্তরে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের মধ্যে আশাবাদ দেখা গেলেও সরকার গঠনের বিষয়ে উদ্বেগও ছিল। দীর্ঘদিনের লিকুদ সমর্থক মেয়ার কোহেন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। তাঁর বিশ্বাস, নেতানিয়াহু দেশের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবেন।

অন্য সমর্থকেরা ইসরায়েলি সমাজের রাজনৈতিক বিভাজন কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, বিক্ষোভ ও সামাজিক উত্তেজনা কাটিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

এক সমর্থক বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এমন নেতৃত্ব দরকার, যিনি বিভক্ত জনগোষ্ঠীকে একত্র করতে পারবেন।

সামনে কঠিন সরকার গঠনের সমীকরণ

প্রাথমিক জরিপে লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এলেও নেতানিয়াহুর জোটের সামনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের পক্ষেও প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করা সহজ নয়। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসনসংখ্যা দুই পক্ষের সরকার গঠনের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চূড়ান্ত ফলাফল, দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা এবং সম্ভাব্য জোটের আলোচনা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—নেতানিয়াহু আবারও সরকার গঠন করতে পারবেন, নাকি ইসরায়েলে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথ তৈরি হবে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।