ঢাকা: পুলিশের কিছু সদস্য এখনও ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, কোনো পুলিশ সদস্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সরকার পিছপা হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার বা আইন প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নিশ্চিত করাও পুলিশের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, সরকার এমন একটি পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে চায়, যা দক্ষতা ও পেশাদারিত্বে আধুনিক, প্রযুক্তিতে সক্ষম, আচরণে মানবিক, আইন প্রয়োগে দৃঢ় এবং দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষ হবে। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পুলিশকে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিকায়নের উদ্যোগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল জালিয়াতি, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এসব মোকাবিলায় প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতির পাশাপাশি প্রযুক্তি, তথ্য ও আধুনিক তদন্ত কৌশলের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশে একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে দক্ষ পুলিশ সদস্যদের কাজে লাগিয়ে এই ইউনিট গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জনআস্থা ফেরানোকে গুরুত্ব
পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক, আইনগত ও প্রশাসনিক সহায়তার মাধ্যমে পুলিশকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি। পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়টিও উপলব্ধি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে জনগণের সঙ্গে সম্মানজনক ও মানবিক আচরণ করতে হবে। মানুষের কথা শুনতে হবে এবং তাদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে আইনের আওতায় দ্রুততম সময়ে প্রত্যাশিত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ পুনর্গঠনের প্রসঙ্গ
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, বাহিনীর দক্ষ ও নিষ্ঠাবান সদস্যরা পুলিশকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ভূমিকা রাখবেন।
পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন ও কল্যাণের বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলেও জানান তিনি। প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে উল্লেখ করেন।
পদকপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান
পদকপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পদক তাদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি হলেও এর সঙ্গে আরও বড় দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারও যুক্ত রয়েছে। দায়িত্ব পালনে তাদের সততা, সাহস, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের আরও বেশি পরিচয় দিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ৯২ জন পুলিশ সদস্যকে চারটি ক্যাটাগরিতে পুলিশ পদক দেওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কঠোর ব্যবস্থা
পুলিশের তৃণমূল পর্যায় থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবাইকে শৃঙ্খলা মেনে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে শতভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হলেও শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থান নেবে। কোনো পুলিশ সদস্য দায়িত্বে অনিয়ম বা শৃঙ্খলাভঙ্গ করলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গুরুতর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও করা হতে পারে।
পুলিশকে রাজনৈতিক অপব্যবহার থেকে দূরে রাখার বার্তা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, তাঁর ভাষায় ‘পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি’ অতীতে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশ বাহিনীকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে এবং জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর দাবি, অনেক পুলিশ সদস্য সে সময় অবৈধ ও বেআইনি নির্দেশ পালনে বাধ্য হয়েছিলেন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের সংশোধনের এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং জনগণের সঙ্গে মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি উদ্যোগেও পুলিশ বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।





