গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলীয় শহর বুকাভুতে দুটি স্কুল ও আশপাশের আবাসিক এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী বলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে বুকাভুর চিম্পুন্ডা এলাকায় আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে তা দ্রুত পাশের উজামা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফুরাহা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘনবসতিপূর্ণ ওই এলাকায় কাঠসহ সহজে দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি স্থাপনার সংখ্যা বেশি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডে দুই স্কুলের পাশাপাশি আশপাশের প্রায় ৩০০টি কাঠের ঘরও পুড়ে যায়।
আতঙ্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পদদলন
আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর স্কুল থেকে বের হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্কুলগুলোর বের হওয়ার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বের হওয়ার চেষ্টা করলে হুড়োহুড়ি ও পদদলনের ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুনঃ ফাতিমার অলরাউন্ড নৈপুণ্যও বাঁচাতে পারল না পাকিস্তানকে, ফাইনালে শ্রীলঙ্কা
অনেকে জানালা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। আবার আগুন ও ঘন ধোঁয়ার মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আহতদের মধ্যে গুরুতর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত অনেক শিক্ষার্থীকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
আরও পড়ুনঃ পল্লবীতে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে ১৩ জন গ্রেপ্তার
স্থানীয় কর্মকর্তা প্যাট্রিস বুদুগের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, আগুন থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এ সময় অনেকে একে অপরের ওপর পড়ে যান এবং কয়েকজন জ্ঞান হারান। পদদলনের কারণেও প্রাণহানি হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বিদ্রোহী গোষ্ঠী এম২৩-এর মুখপাত্র লরেন্স কানিউকা প্রাথমিকভাবে ২৪ শিক্ষার্থী নিহত এবং ২৯ জন চিকিৎসাধীন থাকার কথা জানান।
পরে দক্ষিণ কিভু প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ নিহতের সংখ্যা ২৬ বলে জানায়। সর্বশেষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৯ হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্যে নিহতদের মধ্যে ১৯ জন মেয়ে ও পাঁচজন ছেলে শিক্ষার্থী থাকার কথা বলা হয়েছিল। পরে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিহত ছেলেশিক্ষার্থীর সংখ্যা সাত বলে জানানো হয়। ফলে নিহতদের পরিচয় ও মোট সংখ্যার তথ্য এখনো হালনাগাদ করা হচ্ছে।
গুরুতর আহত অনেকে
অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিপুলসংখ্যক আহতকে ভর্তি করা হয়েছে। এম২৩-এর মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৯ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং তাদের মধ্যে ২১ জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
এদিকে স্থানীয় এক নার্স জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী এবং কয়েকজন শিক্ষককে গুরুতর শ্বাসকষ্টের অবস্থায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনা হয়।
পুড়ে গেছে প্রায় ৩০০ ঘর
আগুন শুধু স্কুল দুটিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দ্রুত তা পাশের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ কিভু প্রদেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০টি কাঠের ঘর আগুনে পুড়ে গেছে।
আরও পড়ুনঃ ফাতিমার অলরাউন্ড নৈপুণ্যও বাঁচাতে পারল না পাকিস্তানকে, ফাইনালে শ্রীলঙ্কা
ঘটনাস্থলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা গেছে। পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও বিকৃত টিনের কাঠামোর পাশাপাশি আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও বিভিন্ন স্থানে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
আগুনের কারণ তদন্তে
অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন কোথা থেকে শুরু হয়েছিল এবং কী কারণে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, তা জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই হবে ভারত সফর: দীনেশ ত্রিবেদী
কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, একটি বাড়ি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের প্রকৃত উৎস বা কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
সংঘাতকবলিত বুকাভুতে নতুন সংকট
দক্ষিণ কিভু প্রদেশের রাজধানী বুকাভু পূর্ব কঙ্গোর দীর্ঘদিনের সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুয়ান্ডার সমর্থনপুষ্ট বলে অভিযোগ থাকা এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠী শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে ওই এলাকায় গোষ্ঠীটির প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে।
খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ পূর্ব কঙ্গোতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত চলছে। এর ফলে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এমনিতেই নানা চাপে রয়েছে। এর মধ্যেই ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করেছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আরও কেউ আটকে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে এম২৩ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে পূর্ব কঙ্গো এমনিতেই গুরুতর মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। স্কুলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি সেই সংকটের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।



