দেশে উৎপাদিত পাটকে উচ্চমূল্যের বহুমুখী পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের বাইরে রেশম, তাঁত ও বহুমুখী পাটপণ্যসহ সম্ভাবনাময় দেশীয় শিল্পের বিকাশে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) প্রাঙ্গণে ছয় দিনব্যাপী ‘বহুমুখী পাটপণ্য মেলা’ এবং নতুন বিক্রয় ও প্রদর্শন কেন্দ্র ‘JDPC EXPRESS’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
পাটে বাড়াতে হবে মূল্য সংযোজন
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, কাঁচা পাট সরাসরি রপ্তানির পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তর করা গেলে একই পরিমাণ পাট থেকে কয়েক গুণ বেশি আয় করা সম্ভব।
তিনি জানান, কাঁচা পাটকে পর্যায়ক্রমে স্লাইভার, প্যাকেজিং, ব্লেন্ডেড ফাইবারসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে জেডিপিসি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সংগঠনগুলো কাজ করছে।
মন্ত্রী বলেন, গত বছর বাজারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতি টন কাঁচা পাটের মূল্য ছিল প্রায় দেড় লাখ টাকা বা প্রায় ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার। একই পরিমাণ পাট প্যাকেজিং পণ্যে রূপান্তর করা গেলে মূল্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে পাটের সঙ্গে তুলা বা অন্যান্য ফাইবার মিশিয়ে ব্লেন্ডেড ফাইবারসহ আরও উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করা গেলে প্রতি টনে প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্য অর্জনের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
পাটের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা
দেশে উৎপাদিত পাটের সর্বোচ্চ অংশকে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কোন খাতে কী ধরনের মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি করা সম্ভব এবং সেসব পণ্যে কত পরিমাণ পাট ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এভাবে পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো গেলে রপ্তানি আয় এবং সরকারের রাজস্ব—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তৈরি পোশাকের বাইরে সম্ভাবনাময় খাত
রেশম, তাঁত ও পাটপণ্যকে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে উল্লেখ করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, এসব খাতের উৎপাদিত পণ্যের প্রচার ও বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করতে জেডিপিসিতে স্থায়ী শোরুম চালু করা হচ্ছে। মেলা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও এসব পণ্যের পরিচিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, মেশিনে তৈরি পণ্যের পাশাপাশি এসব খাতে বিপুল পরিমাণ হস্তনির্মিত পণ্য উৎপাদিত হয়। এর বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র শিল্পের মাধ্যমে বাজারে আসে। সরকার এ খাতগুলোকে আরও বিকশিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে নিয়মিত মেলা, প্রদর্শনী ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রচার বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং পলিথিনের ব্যবহার থেকে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা।
দেশের জিআই পণ্য, বহুমুখী পাটপণ্য, রাজশাহী সিল্ক, তাঁতসহ বস্ত্র খাতের বিভিন্ন পণ্যের পরিচিতি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সোনালি আঁশ’ পাট একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যের কিছুটা ক্ষয় হয়েছে। এখন পাটের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বহুমুখী পণ্যের ব্যবহার এবং দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে পাটকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রচার
প্রতিমন্ত্রী জানান, জেডিপিসির উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত বহুমুখী পাটপণ্যের মেলা আয়োজন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশীয় পণ্যকে আরও বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তেজগাঁওয়ের জেডিপিসি প্রাঙ্গণে চালু হওয়া ‘JDPC EXPRESS’ স্থায়ী বিক্রয় ও প্রদর্শন কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হবে। এখানে বহুমুখী পাটপণ্যের পাশাপাশি তাঁত ও রেশমের বিভিন্ন পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করা হবে।
ভবিষ্যতে দেশের আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের শোরুম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিমানবন্দর ও বিদেশি মিশনে শোরুমের পরিকল্পনা
মো. শরীফুল আলম বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনেও দেশীয় পণ্যের শোরুম বা ডিসপ্লে সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের পরিচিতি ও ব্যবহার বাড়াতে কার্যকর প্রচারের প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যমের সহযোগিতায় দেশীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে সরকার কাজ করতে চায়।
৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে পাটপণ্য মেলা
জেডিপিসি প্রাঙ্গণে আয়োজিত ছয় দিনব্যাপী ‘বহুমুখী পাটপণ্য মেলা’ ৩ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে।
অন্যদিকে নতুন বিক্রয় ও প্রদর্শন কেন্দ্র ‘JDPC EXPRESS’ সপ্তাহের সাত দিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, জেডিপিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহিদ হোসেনসহ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।





