ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই একটি বিতর্ক সামনে আসে—বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা কি তৎকালীন হিন্দু নেতারা করেছিলেন? আবার কেউ কেউ দাবি করেন, হিন্দু শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও সংস্কৃতিসেবীদের অবদান ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিকাশের ইতিহাস কল্পনাই করা যায় না।
এই দুই বক্তব্যের মধ্যে ঐতিহাসিক সত্য অনুসন্ধান করতে হলে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, বিরোধিতার ধরন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অবদান—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯১২ সালে নাথান কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ আলোচনা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ১৯২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয় এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
১. প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় হিন্দু শিক্ষাবিদদের ভূমিকা
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা তৈরির জন্য ১৯১২ সালের ২৭ মে রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, কমিশনে হিন্দু, মুসলিম ও ব্রিটিশ সদস্যরা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আনন্দচন্দ্র রায়, রাশবিহারী ঘোষ এবং জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ললিত মোহন চট্টোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখযোগ্য।
এ তথ্য প্রমাণ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষিত ও পেশাজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।
তবে কমিশনের সদস্য হওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিটি প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই যুক্তিযুক্ত।
২. প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কারা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিরোধিতা নিয়ে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। কয়েকজন প্রভাবশালী হিন্দু নেতা এবং কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত মহলের একাংশ তৎকালীন প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের উদ্বেগের মধ্যে ছিল বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য প্রভাব।
ঐতিহাসিক আলোচনায় এ বিরোধিতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে সেই বিরোধিতাকে তৎকালীন সব হিন্দু মানুষের অবস্থান হিসেবে তুলে ধরা ইতিহাসের যথাযথ পাঠ নয়।
অর্থাৎ, কিছু নেতার রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মনোভাব নির্ধারণ করা যায় না। একইভাবে, কয়েকজন হিন্দু শিক্ষাবিদের অবদান দিয়ে তৎকালীন সব হিন্দু নেতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে ব্যক্তি, সংগঠন, রাজনৈতিক অবস্থান ও সময়ের প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে দেখতে হবে।
৩. জগন্নাথ হল ও হিন্দু শিক্ষাবিদদের অবদান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক ইতিহাসে জগন্নাথ হলের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯২১ সালের ১ জুলাই তিনটি আবাসিক হল নিয়ে যাত্রা শুরু করে—ঢাকা হল, জগন্নাথ হল এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের নিজস্ব ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, হলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্ন থেকেই শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। হলটির প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন অধ্যাপক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত। পরবর্তী সময়ে রমেশচন্দ্র মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও অন্যান্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদও হলটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এই তথ্যগুলো দেখায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিকাশে বিভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের শিক্ষাবিদদের অবদান ছিল। তাঁদের গবেষণা, পাঠদান, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪. সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও বিজ্ঞানচর্চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা করেন। তাঁর গবেষণা আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর নাম থেকেই ‘বোসন’ কণার নামকরণ করা হয়েছে।
তাঁর গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানজগতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়। তবে তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদানকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হলে গবেষণার সময়কাল, প্রকাশনা এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ইতিহাসও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
৫. রমেশচন্দ্র মজুমদার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ঐতিহ্য
ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাবিদ ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৪২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত উপাচার্য তালিকায় তাঁর কার্যকাল উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর মতো শিক্ষাবিদদের অবদান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক একাডেমিক ঐতিহ্য নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁদের গবেষণা ও শিক্ষাদানের ইতিহাস তুলে ধরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে।
৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি জগন্নাথ হল পরিদর্শন করেন এবং হলের পত্রিকা ‘বাসন্তিকা’র জন্য একটি কবিতা রচনা করেন বলে জগন্নাথ হলের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
তবে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সময় ১৯১২ সালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরোধিতা এবং ১৯২৬ সালে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফর—এই দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সফর করা বা কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া থেকে অতীতের প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
তাঁর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কের ইতিহাস বুঝতে সমসাময়িক দলিল, চিঠিপত্র, সফরের বিবরণ এবং নির্ভরযোগ্য গবেষণা একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
৭. ইতিহাসের শিক্ষা: অবদান স্বীকার করুন, ভুল তথ্য পরিহার করুন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো একটি সম্প্রদায়ের একক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, শিক্ষাবিস্তারের দাবি, সরকারি উদ্যোগ, প্রশাসনিক পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় কিছু হিন্দু নেতার অংশগ্রহণের ঐতিহাসিক তথ্য থাকলেও সেটিকে সব হিন্দুর অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। একইভাবে, হিন্দু শিক্ষাবিদদের অবদান তুলে ধরতে গিয়ে তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা সম্পর্কে যাচাইবিহীন দাবি করাও ইতিহাসচর্চার সঠিক পদ্ধতি নয়।
ইতিহাসকে ধর্মীয় বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অবদান ও মতপার্থক্যকে যথাযথ প্রেক্ষাপটে তুলে ধরাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
শেষ কথা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কোনো একক সম্প্রদায়ের গৌরব বা ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি বাংলার শিক্ষা, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার বহুমাত্রিক ইতিহাস।
সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হবে, ভুল তথ্য সংশোধন করতে হবে এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
ইতিহাস মুছে নয়, ইতিহাসের সব দিক জানার মধ্য দিয়েই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।





