রাজনীতির ঊর্ধ্বে আইন: আখতারুজ্জামান ইস্যুতে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে

রাজনীতির ঊর্ধ্বে আইন: আখতারুজ্জামান ইস্যুতে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে
রাজনীতির ঊর্ধ্বে আইন: আখতারুজ্জামান ইস্যুতে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে

সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামী নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে যেমন বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে, তেমনি তাঁর আচরণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি পেতে বিলম্বকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার আখতারুজ্জামানের আচরণের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাঁকে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করতে এবং হুমকিসূচক ভাষা ব্যবহার করতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে জমজমের পানির একটি জার ট্রলি থেকে ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।

বিমানবন্দরের সেবাব্যবস্থায় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যাত্রীদের লাগেজ পেতে বিলম্ব, ট্রলি সংকটসহ বিভিন্ন ভোগান্তির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এসব সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি দাবি করা একজন নাগরিকের অধিকার। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একজন রাজনৈতিক নেতা যখন সরকারি দায়িত্ব পালনরত কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন, তখন তাঁর আচরণে সংযম ও দায়িত্বশীলতার প্রত্যাশা আরও বেশি থাকে।

আখতারুজ্জামান বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিচিত একটি নাম। তিনি কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে পরপর দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়ী হতে পারেননি। একসময় তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ২০২২ সালে তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।

এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের একজন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রকাশ্য স্থানে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত হওয়াই স্বাভাবিক। বিমানবন্দরের কোনো অনিয়ম বা দুর্ভোগের প্রতিবাদ করতে হলে তার জন্য নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনি পথ রয়েছে। কাউকে অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা শারীরিকভাবে আঘাতের হুমকি দেওয়া কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে না।

এখানেই মূল প্রশ্নটি হলো—বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা থাকলে তার দায় নির্ধারণ করবে কে এবং কীভাবে? একজন কর্মকর্তাকে ধমক বা হুমকি দিলেই তো লাগেজ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর হবে না। বরং এ ধরনের আচরণ নতুন করে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ঘটনার পর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন অভিযোগগুলোর সত্যতা ও আইনি দায় নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। ফলে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে কোনো পক্ষেরই বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা উচিত নয়।

আমাদের সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা সুবিধা প্রত্যাশার প্রবণতা নতুন নয়। অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কেউ কেউ সাধারণ নিয়মের বাইরে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করেন। এই সংস্কৃতি শুধু প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করে না, সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইনের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে।

আইনের মৌলিক নীতি হলো—আইনের চোখে সবাই সমান। একজন রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিক—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। একইভাবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করাও আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগের বিচার হবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে।

এই জায়গায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলের কোনো নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয়ের কারণে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা না করে বরং স্বচ্ছ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের সুযোগ করে দেওয়া উচিত।

আখতারুজ্জামানকে নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যও এ কারণে আলোচনায় এসেছে। তিনি এক ফেসবুক পোস্টে আখতারুজ্জামানের ঘটনাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে বিমানবন্দরের যাত্রীদের দুর্ভোগের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদকে তুলে ধরেছেন।

একজন রাজনৈতিক দলের প্রধান তাঁর দলের নেতার পক্ষে বক্তব্য রাখতেই পারেন। তবে যখন কোনো বিষয় আদালতে বিচারাধীন থাকে, তখন রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা ও সংযম প্রয়োজন। বিচারাধীন বিষয়ে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া সমীচীন নয়, যা বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে পূর্বধারণা তৈরি করতে পারে বা আদালতের স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।

আবার এটিও মনে রাখতে হবে, বিমানবন্দরের যাত্রীদের ভোগান্তি বাস্তব সমস্যা হলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করতে হবে। একজন যাত্রী সমস্যার প্রতিবাদ করেছেন—এই কারণে সমস্যাটিকে আড়াল করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রতিবাদের নামে আইনভঙ্গ বা অশালীন আচরণকেও গ্রহণযোগ্য বলা যায় না।

এ ঘটনাকে তাই রাজনৈতিক বিরোধের দৃষ্টিতে না দেখে আইনের শাসন ও নাগরিক আচরণের প্রশ্ন হিসেবে দেখা বেশি জরুরি। একজন নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার আছে, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের সময় অন্য নাগরিকের মর্যাদা ও আইনি অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মানুষের একটি দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো—প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই ধারণা পরিবর্তন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই প্রথমে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। কোনো নেতা অপরাধ করলে তাঁর পরিচয় যেন বিচারের পথে ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়—এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

অপরাধের সঙ্গে দলীয় পরিচয়কে এক করে দেখারও সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তি কোনো দলের সদস্য হলেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—এমন দাবি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে আগেই অপরাধী সাব্যস্ত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

তাই আখতারুজ্জামানকে ঘিরে চলমান বিষয়টির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান হলো—মামলাটি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাক। তদন্ত হোক নিরপেক্ষভাবে, আদালত প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিক এবং সরকার কিংবা কোনো রাজনৈতিক দল বিচারপ্রক্রিয়ায় অযাচিত প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত থাকুক।

একই সঙ্গে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা, লাগেজ সরবরাহ, ট্রলি ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার যে দুর্বলতাগুলো এ ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে, সেগুলোরও কার্যকর সমাধান করা প্রয়োজন।

কারণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু অপরাধের বিচার করা নয়; রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থাকেও জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নাগরিকবান্ধব করে তোলা। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তি নয়, আইন ও প্রতিষ্ঠানই যেন শেষ কথা বলে—এটাই হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলনীতি।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
সংবাদ প্রতিনিধি

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।