যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী আবির্ভাব দিবস

যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী আবির্ভাব দিবস
যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী আবির্ভাব দিবস। ১৮২৮ খৃষ্টাব্দে ৩০ সেপ্টেম্বর বঙ্গ প্রদেশের নদীয়া জেলার ঘুর্ণী গ্রামে( বর্তমানে কৃষ্ণনগর শহরের একটি পাড়া) একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গৌরমোহন লাহিড়ী ও মুক্তকেশীর কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন। যিনি লাহিড়ী মহাশয় নামে বেশি পরিচিত,একজন ভারতীয় যোগী এবং মহাবতার বাবাজির শিষ্য ছিলেন। মহাবতার বাবাজির কাছে শিখে, ১৮৬১ সালে তিনি ক্রিয়াযোগ যোগবিজ্ঞানকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।

তিনি ভারতীয় অন্য ধর্মগুরুদের থেকে ভিন্ন বা আলাদা ছিলেন। তিনি সাধারণ গৃহস্থের মত বিয়ে করেছেন, পরিবার প্রতিপালন করেছেন এবং ব্রিটিশ ভারত সরকারের সামরিক প্রকৌশল বিভাগের একজন হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন, চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন আবার সাধারণ মানুষকে ক্রিয়াযোগের দীক্ষা দিয়েছেন। শ্যামাচরণজী মন্দির বা মঠের পরিবর্তে বারাণসীতে তাঁর পরিবারের সাথে বসবাস করতেন।

কাশীতে বসবাসকালীন শাস্ত্রপাঠ ও ধর্মসাধনায় বিশ্বাসী তার পিতা গৌরমোহন যিনি নিজে প্রত্যহ ঋগ্বেদ পাঠ করতেন, বালক শ্যামাচরণকে বেদজ্ঞ মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ নাগভট্টের কাছে কিছুকাল বেদশিক্ষার্থীরূপে পাঠান। গঙ্গায় স্নান করে বেদ পাঠ এবং পূজা তার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ ছিল। গৌরমোহন প্রাচীন ধর্ম সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী হলেও শ্যামাচরণকে শিশুকাল থেকেই উর্দু এবং হিন্দি অধ্যয়ন করান, পরে সরকারী সংস্কৃত কলেজে বাংলা, সংস্কৃত, ফার্সি, ফরাসি এবং ইংরেজি।

১৮৪৬ সালে, তার শ্রীমতি কাশীমনির সাথে বিয়ে হয়। তাদের দুই পুত্র ছিল, তিনকড়ি ও দুকড়ি এবং তিন কন্যা, হরিমোতি, হরিকামিনী এবং হরিমোহিনী। তার দুই পুত্রকে সাধুসন্ত হিসাবে মানা হত। শালীখার পণ্ডিত বংশীয় তার স্ত্রী, তার শিষ্য হয়ে ওঠেন এবং স্নেহভরে গুরুমা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। ইংরেজ সরকারের সামরিক প্রকৌশল বিভাগের একজন হিসাবরক্ষক হিসেবে, কর্মসূত্রে তিনি সারা ভারতে ঘুরেছেন। তার বাবার মৃত্যুর পর, তিনি বারাণসীতে সমগ্র পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।.

১৮৬১ সালে, শ্যামাচরণকে হিমালয়ের পাদদেশে রানীক্ষেতে বদলি করা হয়। একদিন, পাহাড়ে চলার সময়, তিনি একটি কন্ঠস্বর শুনতে পেলেন, যেন কেউ তাঁর নাম ধরে ডাকছে। আরও উপরে চড়ার পর, তিনি তাঁর গুরু মহাবতার বাবাজির দেখা পেলেন, যিনি ক্রিয়া যোগের কৌশলগুলো তাকে শিখিয়ে তাকে দীক্ষা দিলেন। বাবাজি মহারাজ, শ্যামাচরণকে বলেছিলেন যে তার বাকি জীবনটি জনসাধারণে ক্রিয়াযোগের কথা প্রচারের জন্য উতসর্গ করতে হবে।

শীঘ্রই, লাহিড়ী মহাশয় বারাণসীতে ফিরে আসেন,যেখানে তিনি সক্রিয়ভাবে ক্রিয়াযোগের মার্গ অন্বেষণ শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে, তাঁর থেকে ক্রিয়াযোগের দীক্ষা গ্রহণের জন্য আরো বেশি সংখ্যক লোক আসতে লাগলো। তিনি অনেক ছোট ছোট সভা সংগঠিত করেন এবং ভগবদগীতার উপর তাঁর “গীতা সভা”তে নিয়মিত ভাষণ দেন। যে সময়ে জাতিগত বৈষম্য অনেক শক্তিশালী ছিল, হিন্দু, মুসলমান ও খ্রিস্টান সহ প্রত্যেক ধর্মবিশ্বাসের জন্য তিনি উন্মুক্তভাবে ক্রিয়াযোগ দীক্ষা দেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের যা তারা ইতিমধ্যেই অনুশীলন করছিল তাতে ক্রিয়াযোগ করে, তাদের নিজস্ব ধর্মের রীতিনীতি মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করতেন।

১৮৮৬ সালে পেনশনে অবসর গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনি কর্মজীবনে হিসাবরক্ষক ও তাঁর পরিবারের দায়িত্বভারের দ্বৈত ভূমিকা এবং ক্রিয়াযোগের শিক্ষকতা অব্যাহত রাখেন। এই সময়ে তাঁকে আরও লোক দর্শন করতে আসতেন। অধিকাংশ সময় তিনি বৈঠকখানা ঘরে থাকতেন, সবার জন্য তার দর্শন অবারিত ছিল। তিনি মাঝে মাঝেই পরম চৈতন্য সমাধির স্পন্দনহীন অবস্থার প্রদর্শন করতেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি মালী, পোস্টম্যান, রাজা, মহারাজা, সন্ন্যাসী, গৃহস্থ, নিম্ন বর্ণ বলে পরিচিত, খ্রিস্টান এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের দীক্ষা দেন। সেই সময়ে, একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের পক্ষে সকল বর্ণের মানুষের সাথে এত ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখা কঠিন ছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে পঞ্চানন ভট্টাচার্য, যুক্তেশ্বর গিরি, প্রণবানন্দ, কেশবানন্দ ব্রহ্মচারী, ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল এবং পরমহংস যোগানন্দের পিতামাতাও ছিলেন। অন্যান্য যাঁরা শ্যামাচরণের থেকে ক্রিয়াযোগ দীক্ষা গ্রহণ করেন তাঁরা হলেন বেনারসের ভাস্করানন্দ সরস্বতী, দেওগড়ের বালানন্দ ব্রহ্মচারী, বেনারসের মহারাজা ঈশ্বরীনারায়ণ সিংহ বাহাদুর ও তাঁর পুত্র।

জীবনী লেখক এবং যোগাচারী ডঃ অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বই “পুরাণ পুরুষ” গ্রন্থে, লাহিড়ীর ২৬ টি গোপন ডায়েরির একটি অধ্যায়ের উপর ভিত্তি করে, শ্যামাচরণ শিরডি সাই বাবাকে ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত করেছিলেন একথা লেখেন। তিনি তার একজন শিষ্য পঞ্চানন ভট্টাচার্যকে ক্রিয়াযোগ শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর জন্য কলকাতায় একটি সংস্থা চালু করার জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন। আর্য মিশন ইনস্টিটিউশন অন্যান্য আধ্যাত্মিক বই সহ গীতাতে লাহিড়ীর ব্যাখ্যা এবং গীতার বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত করেন। শ্যামাচরণ নিজে , বাংলা ও হিন্দিতে গীতা থেকে উদ্ধৃত অংশ সমেত হাজার হাজার ছোট বই মুদ্রিত করেন এবং বিনামূল্যে বিতরণ করেন সে সময়ে এটি একটি বিরল ধারণা ছিল।

মূল আধ্যাত্মিক অনুশীলন যা তিনি তার শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন সেটি অভ্যন্তরীণ প্রাণায়াম অনুশীলনের একটি ধারাবাহিক ক্রম তা হল ক্রিয়া যোগ, যা দ্রুতই অনুশীলনকারীদের আধ্যাত্মিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করে । ধর্মীয় পটভূমি নির্বিশেষে শেখার জন্য আন্তরিক, এমন সবাইকে তিনি এই কৌশল শেখান। শিষ্যরা তার কাছে নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে আসতেন, সবার উত্তরে, তার পরামর্শ একটাই – আরো ক্রিয়াযোগ অনুশীলন।

তিনি বলেছিলেন: সর্বদা মনে রাখবে যে তুমি কারোর নও এবং কেউ তোমার নয়। গভীরভাবে চিন্তা কর হঠাৎ কোন একদিন তোমায়, এই বিশ্বের সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই এখন থেকে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। প্রত্যেকদিন ঈশ্বরের অনুভূতির ব্যোমযানে চড়ে, আসন্ন মৃত্যুর বিশুদ্ধ যাত্রায় নিজেকে প্রস্তুত করো। মোহের বশে তুমি নিজেকে হাড়, মাংসের একটি জীবন হিসাবে ভাবছ, যা প্রকৃতপক্ষে সমস্যার বাসা। নিরবচ্ছিন্নভাবে ধ্যান করো, খুব দ্রুত নিজেকে সকল কষ্ট থেকে মুক্ত, অবিচ্ছিন্ন উপাদান হিসাবে দেখতে পাবে। দেহের অধীন বন্দী হওয়া বন্ধ কর; ক্রিয়ার গোপন চাবি ব্যবহার করে, আত্মায় মুক্ত হতে শেখ।

তিনি শিখিয়েছিলেন যে ধর্মগ্রন্থগুলির নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা ব্যতীত ক্রিয়া অনুশীলন, যোগীকে সত্যের সরাসরি অভিজ্ঞতা দিতে পারে এবং ধ্যানের সাহায্যে সব সমস্যার সমাধান কর। ঈশ্বরের সঙ্গে প্রকৃত যোগাযোগের জন্য অলাভজনক ধার্মিক আলোচনা বিনিময় কর। উদ্ধত আধ্যাত্মিক আবর্জনা থেকে নিজের মন পরিষ্কার রাখ; অনুভূতির তাজা, নিরাময়ক জলের মধ্যে সব ধুয়ে যাক। অন্তরের সক্রিয় পথনির্দেশনার যোগসূত্রে নিজেকে বাঁধ। জীবনের সব সমস্যার জবাব আছে ঐশ্বরিক শক্তির কাছে। যদিও নিজেকে বিপদে ফেলার জন্য মানুষের উদ্ভাবনী দক্ষতা অবিরাম, অসীম সাহায্যকারীও কম সমৃদ্ধ নয়।

শ্যামাচরণ প্রায়ই ক্রিয়া-যোগের প্রসঙ্গে গুরু-শিষ্য সম্পর্কের কথা বলেছেন। তিনি সর্বদা ক্রিয়া পদ্ধতিকে একটি দীক্ষা হিসাবে দিয়েছেন এবং শেখানো হয় যে এই কৌশলটি কেবলমাত্র গুরু-শিষ্য সম্পর্কের অংশ হিসাবে সঠিকভাবে শেখা যায়। প্রায়শই তিনি সেই উপলব্ধির কথা উল্লেখ করেছেন যেটি গুরু দ্বারা শেখানোয় আসে এবং সেই করুণার কথা যা গুরুর সংস্পর্শে আসে। তিনি এটাও শিখিয়েছিলেন যে গুরুর কথা পালন করলে তার করুণা স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়। তিনি ধ্যানের সময় গুরুর সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন, পরামর্শ দেন যে তাকে সশরীরে দেখতে হবে সবসময়ই এটির প্রয়োজন হয় না।

তিনি ক্রিয়াযোগের জন্য গুরুর প্রয়োজনীয়তা বলতে গিয়ে বলেন: সব ভক্তের তাদের গুরুকে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করা, অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শিষ্য গুরুকে যত আত্মসমর্পণ করতে পারেন, ততটা তিনি তাঁর গুরুর থেকে যোগের সূক্ষ্ম থেকে অতিসূক্ষ্ম কৌশলগুলি শিখতে পারেন। আত্মসমর্পণ ছাড়া, গুরুর থেকে কিছু পাওয়া যায় না।

লাহিড়ী মহাশয়ের সাথে তার নিজের শিষ্যদের সম্পর্ক ছিল খুবই স্বতন্ত্র। শিষ্যদের আধ্যাত্মিক প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী আলাদা আলাদাভাবে তিনি তাদের ক্রিয়াযোগ শেখাতেন।

তিনি বলতেন, সংসার করেও মানুষ ঈশ্বরের আরাধনা করতে পারে। আর যোসাধনা করতে হবে গোপনীয়তার সঙ্গে। মৃত্যুর কয়েকমাস আগে যোগীরাজ তার স্ত্রী কাশীমণিকে ডেকে বললেন, “দেখ, আমার যাবার সময় ঘনিয়ে এল। অন্যলোকে আমি যাবার পর কিন্তু শোক করতে পারবে না।

কয়েকজন বিশিষ্ট ভক্তকেও তিনি তার মহাপ্রয়াণের আভাস দেন। তার খুব খারাপ জাতের পৃষ্ঠব্রণ হয়েছিল।

১৮৯৫ সালে তিনি তার শিষ্যদের একত্রিত করতে শুরু করলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ জানতে পারে যে তিনি শীঘ্রই শরীর ছেড়ে যাবেন। তার মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে, তিনি কেবল বলেছিলেন, “আমি বাড়ি যাচ্ছি, সান্ত্বনা পাও, আমি আবার আসব।” এরপর উত্তর দিকে তিনি তার শরীরকে প্রায় তিন বার ঘোরালেন এবং সচেতনভাবে তার শরীর ত্যাগ করে “মহসমাধি” নিলেন।

১৮৯৫ খৃষ্টাব্দের ২৬শে সেপ্টেম্বর গীতার শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী গোলকধামে যাত্রা করলেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।