গরুর ব্যবসায়ীকে পেটালেন এমপিপুত্র

সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ সাতক্ষীরায় সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩১২ এর সংসদ সদস্য মিসেস রিফাত আমিনের বিতর্কিত পুত্র সাফায়াত সরোয়ার রুমনের বিরুদ্ধে এবার গরুর এক ব্যবসায়ীকে বেধরক পেটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য রুমন ও এক ব্যবসায়ী এই ঘটনা ঘটান।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সদর উপজেলার মিল বাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

নির্যাতনের শিকার ব্যবসায়ীর নাম সাহেব আলী। সদর উপজেলার পদ্মশাকরা গ্রামের বাসিন্দা সাহেব আলী বর্তমানে সাতক্ষীরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নির্যাতনের ঘটনায় তিনি এমপি পুত্রসহ তিনজনের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা থানায় মামলা করেছেন।

রুমন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩১২ এর সংসদ সদস্য মিসেস রিফাত আমিনের ছেলে। মায়ের নামে লাইসেন্স করা পিস্তল, ৪৩টি গুলি ও তিন তরুণীসহ গত ২০ মে রুমনকে আটক করে পুলিশ। পরে কিছুদিন কারাভোগ শেষে জামিনে মুক্তি পান।

পুলিশ জানিয়েছে, সাফায়াত সরোয়ার রুমন দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। সেখানে একটি অনৈতিক কাজের দায়ে সৌদি সরকার তাঁকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ঢাকার শাহবাগে মাদকসহ রুমন একবার আটক হয়েছিলেন। এ ছাড়া সাতক্ষীরা শহরের বিউটি হোটেলে নারীসহ হাতেনাতে আটক হন রুমন। কয়েক মাস আগে ইকবাল হোসেন নামের একজন শিক্ষককে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করেন।

সাহেব আলী বলেন, তিনি একজন ভারতীয় গরুর ব্যবসায়ী। ভারতীয় গরু বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছানো হলে তিনি তা পাইকারি দামে কিনেন নগদে অথবা বাকিতে। এই গরু বাংলাদেশে বিক্রির পর হাতে আসা টাকা গরুর ভারতীয় মালিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী মিলন পাল। সাতক্ষীরা শহরের পাকাপুলের মোড়ে মিলনের জুয়েলারি দোকান মিলন জুয়েলার্স রয়েছে। মিলন তাঁর টাকা নিয়ে তার বিনিময়ে সোনা কিনে পাঠিয়ে দেন ভারতে। এভাবে দীর্ঘদিন ব্যবসা চলছিল মিলনের সঙ্গে।

সাহেব আলী জানান, বাংলাদেশি গরুর ব্যবসায়ীদের কাছে তাঁর ৩৮  লাখ টাকা বাকি পড়েছে। এ টাকা আদায় করতে পারছেন না। আবার মিলনও তাঁর কাছে ৩৯ হাজার টাকা পাবেন। তাও শোধ দিতে পারছেন না।

এ অবস্থায় মঙ্গলবার বিকেলে সাহেব আলীর কাছে ফোন করেন মিলনের বাবা জুয়েলারি মালিক দেবদাস পাল। তিনি তাঁকে জরুরি ভাবে সাতক্ষীরায় তাঁর দোকানে যেতে বলেন।

সাহেব আলী বলেন, ‘আমি রোজা বলে অপারগতা প্রকাশ করি। পরে আলোচনার কথা বলে আমার বাড়িতে দুজন অপরিচিত লোককে পাঠানো হয়। তারা মাইক্রোতে এসে আমাকে তুলে নিয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘আমাকে তাঁদের মিলন জুয়েলার্সে নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন, তাঁর বাবা দেবদাস পাল। আমি টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে রুমন ও মিলনসহ কয়েকজন আমাকে ফের সেই মাইক্রোতে তুলে নিয়ে যায় মিলনের বাগানবাড়ি মিল বাজার এলাকায়।

সেখানে নিয়ে প্রথমে কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকেন। পরে লোহার রড ও হকি স্টিক নিয়ে এসে নির্দয়ভাবে মারপিট করা হয় আমাকে। মুখে বলে, হয় টাকা দে, না হলে তোর বউকে তুলে আনব।  আমার বুকের ওপর লোহার রড রেখে দুই পাশে পা দিয়ে চাপ দেয়। একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে তারা আমাকে বলে বাড়িতে ফোন করতে। নগদ টাকা ও  ব্যাংকের চেক নিয়ে আসতে বলে। আমার নিকট প্রতিবেশী শফিকুল ইসলামকে জানালে তিনি আমার বাড়ি থেকে নগদ ৬১ হাজার টাকা ও ইসলামী ব্যাংকের একটি চেক নিয়ে আসেন। চেকটি মিলনের বাবার কাছে দিলে তিনি তা টর্চারের স্থানে পাঠিয়ে দেন। এবার আমাকে বাধ্য করা হয় চেকে চার লাখ ৩৯ হাজার টাকা লিখে স্বাক্ষর করতে। এরপর রুমন ও মিলন আমাকে মাইক্রোবাসে পাকাপুলের মোড়ে মিলন জুয়েলার্সের সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়।’

সাহেব আলী বলেন, ‘আমার বিপদের কথা শুনে আমার আত্মীয়স্বজনরা এসে আমাকে সাতক্ষীরা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে দেন। আমি এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা থানায় একটি মামলা জমা দিয়েছি। ন্যায়বিচার পাব কি না জানি না।’

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে মিলন জুয়েলার্সের মিলন পালের কাছে ফোন করা হলে তিনি বলেন, সাহেব আলীর কাছে ব্যবসায়িক পাঁচ লাখ টাকা পাব। তাই বাড়ি থেকে ডেকে এনেছিলাম। তখন আমার দোকানে এমপি পুত্র রুমন উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে মারধর করা হয়নি। তিনি স্বেচ্ছায় ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর দিয়ে গেছেন।’

সাহেব আলীকে বাগান বাড়িতে নিয়ে দেড় ঘণ্টা মারপিট করে নির্যাতন অথবা জোর করে চেকে সই করানোর কোনো কিছুই স্বীকার না করে এড়িয়ে যান মিলন পাল। তিনি দাবি করেন, ‘রুমন মারেননি, আমিও মারিনি।’ পেটানোর ব্যাপারে এমপিপুত্র রুমন বক্তব্য দেননি।

মামলা সম্পর্কে থানায় জানতে চেয়ে ফোন করা হলে ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার হাতে এমন অভিযোগ এখনোআসেনি। অভিযোগ জমা হয়ে থাকলে তা রেকর্ডের প্রক্রিয়াধীন থাকতে পারে।’

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।