আজ ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আলঝেইমার দিবস। আলঝেইমার রোগ ও অন্যান্য ধরনের ডিমেনশিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, রোগী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা তৈরি এবং রোগটিকে ঘিরে থাকা ভুল ধারণা ও সামাজিক stigma কমানোই দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য।
প্রতি বছর সেপ্টেম্বরজুড়ে বিশ্ব আলঝেইমার মাস পালিত হয়, যার কেন্দ্রীয় দিন ২১ সেপ্টেম্বর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই উপলক্ষে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, আলোচনা, প্রচারাভিযান, স্মরণ পদযাত্রা ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আলঝেইমার রোগ কী?
আলঝেইমার রোগ মস্তিষ্কের একটি প্রগতিশীল রোগ, যা ধীরে ধীরে স্মৃতি, চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ এবং WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ডিমেনশিয়ার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে আলঝেইমার রোগের ভূমিকা রয়েছে।
ডিমেনশিয়া কোনো নির্দিষ্ট একটি রোগের নাম নয়; এটি এমন একটি অবস্থাকে বোঝায় যেখানে বিভিন্ন রোগ বা মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণে স্মৃতি, চিন্তাভাবনা ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়লেও এটিকে স্বাভাবিক বার্ধক্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
কী কী উপসর্গ দেখা দিতে পারে?
আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার লক্ষণ ব্যক্তি ও রোগের পর্যায়ভেদে ভিন্ন হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে সাম্প্রতিক ঘটনা বা তথ্য ভুলে যাওয়া, জিনিসপত্র কোথায় রাখা হয়েছে তা মনে করতে না পারা, পরিচিত জায়গায় বিভ্রান্ত হওয়া, সময় সম্পর্কে ধারণা হারানো কিংবা কথোপকথনে সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান, পরিচিত কাজ সম্পন্ন করা, যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে অন্যের সহায়তার প্রয়োজন বাড়তে পারে। আচরণ ও মেজাজেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
কেন হয়, ঝুঁকি বাড়ায় কোন বিষয়গুলো?
আলঝেইমার রোগের পেছনে একাধিক জৈবিক ও জেনেটিক কারণ কাজ করতে পারে। ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি-উপাদান। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ঘুমের সমস্যা, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং স্ট্রোকসহ বিভিন্ন বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত WHO-এর হালনাগাদ নির্দেশনায় শারীরিক সক্রিয়তা, ধূমপান বন্ধ করা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, রক্তচাপ-রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকার মতো পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব আলঝেইমার দিবসের গুরুত্ব
এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সঠিক ধারণা তৈরি করা। রোগটিকে ঘিরে ভুল ধারণা ও সামাজিক কলঙ্ক অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য চিকিৎসা, সহায়তা এবং সামাজিক জীবনে নানা বাধা তৈরি করতে পারে।
তাই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও যত্ন নিশ্চিত করা এবং পরিবারের সদস্য ও পরিচর্যাকারীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কবে থেকে পালিত হচ্ছে বিশ্ব আলঝেইমার দিবস?
২১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সালে প্রথম বিশ্ব আলঝেইমার দিবস পালিত হয়। Alzheimer’s Disease International (ADI)-এর বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় দিবসটি চালু করা হয়েছিল। ADI ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক ফেডারেশন, যা বিশ্বের বিভিন্ন আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া সংগঠনকে নিয়ে কাজ করে।
পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসকে World Alzheimer’s Month হিসেবে সচেতনতা কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়। ADI-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব আলঝেইমার মাস ২০১২ সালে শুরু হয়।
সচেতনতা কর্মসূচিতে কী থাকে?
বিশ্ব আলঝেইমার দিবস ও মাস উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে সচেতনতামূলক আলোচনা, শিক্ষামূলক কর্মসূচি, জনসচেতনতা প্রচার, স্মরণ পদযাত্রা, তহবিল সংগ্রহ এবং রোগী ও পরিচর্যাকারীদের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ব শান্তি দিবস আজ: যুদ্ধ-সংঘাত বন্ধের আহ্বানে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস
শিক্ষামূলক প্রচারের মাধ্যমে আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে জানানো, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং রোগী ও পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ উৎসাহিত করা হয়।
আগেভাগে সচেতন হওয়া জরুরি
স্মৃতিশক্তি বা চিন্তাশক্তিতে অস্বাভাবিক ও ক্রমাগত পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক প্রভাব মনে না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ডিমেনশিয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে এবং দ্রুত মূল্যায়ন করলে সংশ্লিষ্ট কারণ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডিমেনশিয়া বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়া নিয়ে বসবাস করছিলেন, এবং প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি নতুন আক্রান্তের ঘটনা ঘটে।
বিশ্ব আলঝেইমার দিবস তাই শুধু একটি সচেতনতামূলক দিবস নয়; এটি স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত মানুষ, তাঁদের পরিবার, পরিচর্যাকারী এবং সমাজের প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।





