বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক: একটা তীব্র বাসনা আমাদের মধ্যে সবসময় কাজ করে মহাশূন্যে কী আছে সেটা দেখার জানার। মহাকাশে আর কী কী গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ রয়েছে, কিংবা অজানা কী নক্ষত্র রয়েছে হাজার কোটি মাইল দূরে সেটা আমরা জানতে চাই। পৃথিবীর মতো আর কোনো গ্রহ কি রয়েছে মহাবিশ্বের কোনো প্রান্তে, যেখানে আছে আমাদের মতো কোনো প্রাণি? কিংবা কোন উল্কা বা গ্রহাণু কি ছুটে আসছে পৃথিবীর দিকে? মানুষের চোখের ক্ষমতা সীমিত কিন্তু তার দেখার ইচ্ছা অনন্ত। আর ঠিক এই জন্যই ১৯৯০ সালে পৃথিবীর কক্ষপথে আমরা বসিয়েছি একটা বিরাট চোখ। নাম দিয়েছি হাবল টেলিস্কোপ। মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবলের প্রতি সম্মান রেখেই এই নাম।
হাবল মহাশূন্য দূরবীন আমাদেরকে উপহার দিয়েছে হাজারো বিস্ময়কর সব ছবি, ক্রমাগত মিটিয়ে চলেছে আমাদের জ্ঞান বাসনা। কিন্তু মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা কিছুদিন আগে ঘোষণা দিয়েছিল হাবল আর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই অবসরে যাচ্ছে। হাবলের বয়স হয়ে গেছে। অনেক করেছে মানুষের জন্য। গত ২৫ বছর ধরে তারাদের আর ছায়াপথের ছবি তুলতে তুলতে এখন সে ক্লান্ত। আর কতো!
কিন্তু দায়িত্ব থেকে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হাবল এখনো তুলে চলেছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চমৎকার সব ছবি। এ সপ্তাহে হাবল ধারণ করেছে পূর্ব পরিচিত এক ছায়াপথের বিশালাকৃতির একটি কৃষ্ণগহ্বরের (ব্ল্যাক হোল) স্পষ্ট ছবি।
কৃষ্ণগহবরটি এনজিসি- ৪৮৮৯ নামের ছায়াপথে অবস্থিত। কোমা ক্লাস্টারের (১ হাজার ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত একগুচ্ছ ছায়াপথ) এই ছায়াপথটিতে অবস্থিত নিষ্ক্রিয় এই কৃষ্ণ গহ্বরটির ব্যাস ১৩০ বিলিয়ন কিলোমিটার। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, এটার মহাকর্ষ শক্তি এতোই প্রবল যে এমনকি আলোও এর থেকে মুক্তি পায় না। যার ফলে হাবলের ছবিতে একে দেখা যায় না।
শুধু দেখা যায়, কৃৃষ্ণগহ্বরটি ঘিরে নক্ষত্রগুলোর উপবৃত্তাকার কক্ষপথ। যে নক্ষত্রগুলো একে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে সেগুলোর বেগ নির্ণয় করে বিজ্ঞানীরা সেটির অস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন।
এ ব্যাপারে নাসা এবং এসা একটি যৌথ বিবৃতিতে বলে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, দানবাকৃতির এই কৃষ্ণগহ্বরটি এনজিসি- ৪৮৮৯ ছায়াপথের একটা বড় অংশ গ্রাস করে এখন ভক্ষণ বন্ধ করে বিশ্রাম করছে। যে কারণে ঐ ছায়াপথের পরিবেশ এখন খুবই শান্ত। নতুন নতুন নক্ষত্র সৃষ্টি হচ্ছে অবশিষ্ট গ্যাস থেকে এবং তারা এলোমেলোভাবে আবর্তিত হচ্ছে কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে।
নাসার মতে, প্রত্যেক ছায়াপথেই একটা দানবাকৃতির কৃষ্ণগহ্বর থাকে, যেটার কেন্দ্রের ভর হয় ১০ লাখ সূর্যের ভরের সমান। ধারণা করা হয়, এই কৃষ্ণগহ্বর মূলত ছায়াপথ তৈরির সময় একইসাথে তৈরি হয়। নাসার ওয়াইড ফিল্ড ইনফ্রারেড সার্ভে টেলিস্কোপ বিভাগের প্রধান রোনাল্ড ভান ডার মারেল বলেন, এনজিসি- ৪৮৮৯ ছায়াপথের নিষ্ক্রিয় এই কৃষ্ণগহ্বরটি অন্য কোনো ছায়াপথের সাথে সংঘর্ষে এলে আবার সক্রিয় হয়ে যেতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের ছায়াপথ কি এই কৃষ্ণগহ্বরের ফাঁদে পড়বে? ভান ডার মারেলের মতে, সেই সম্ভাবনা নেই। এনজিসি- ৪৮৮৯ ছায়াপথ আমাদের থেকে ৩০ কোটি আলোকবর্ষ (আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার। বছরে আলো যে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করে সেটাই আলোকবর্ষ) দূরে। আমাদের আকাশগঙ্গা (মিল্কিওয়ে) ছায়াপথ থেকে এটা অনেক দূরে। আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে কাছের ছায়াপথ হচ্ছে অ্যানড্রোমিডা। এটার দূরত্ব ২৫ লাখ আলোকবর্ষ।
কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তীব্র কৌতূহল রয়েছে। অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষ বল সমৃদ্ধ কৃষ্ণগহ্বরের ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন আঠারো শতকের বিজ্ঞানী জন মিচেল এবং পিয়েরে সিমন। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রথম ব্যাখ্যা দেয়- তীব্র মহাকর্ষ বলের প্রভাবে কীভাবে স্থান-কাল বেঁকে গিয়ে কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করে। বর্তমানের পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংও কাজ করে যাচ্ছেন কৃষ্ণগহ্বর ওপরে তার কোয়ান্টাম তত্ত্ব (অণু পরমাণু পর্যায়ে পদার্থ এবং শক্তি কীভাবে কাজ করে) নিয়ে। কৃষ্ণগহ্বর থেকে আলো পর্যন্ত বের হতে পারে না, কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে ভিন্ন কথা। সেই কারণেই বোধ হয় তিনি বলেছেন : ‘There is no escape from a black hole in classical theory, but quantum theory enables energy and information to escape.’ (ধ্রুপদী তত্ত্ব মতে, কৃষ্ণগহ্বর থেকে কিছুই মুক্তি পায় না কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলে সেখান থেকে শক্তি ও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।)





