জেনে নিন একাদশী উপবাসের নিয়ম

জেনে নিন একাদশী উপবাসের নিয়ম
Ekadashi Fasting mystery

আজ ভৈমী একাদশী/জয়া একাদশী। মাঘী শুক্লপক্ষীয়া ‘জয়া’ একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য ভবিষ্যোত্তর পুরাণে যুধিষ্ঠির-শ্রীকৃষ্ণ সংবাদরূপে বর্ণিত আছে। শ্রীগরুড়পুরাণে মাঘ মাসের শুক্লাপক্ষীয়া একাদশী তিথিকে ‘ভৈমী’ একাদশী নামে অভিহিত করা হয়েছে। কল্পান্তরে বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন নাম দেখা যায়। পদ্মপুরাণ অনুসারে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষীয়া একাদশীর নামই ‘পান্ডবা নির্জলা’ বা ‘ভীমসেনী’ (ভৈমী) একাদশী।  চাঁদের শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় ও পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় এই দশ ইন্দ্রিয় ও মন স্থির করে ভগবৎ সমীপে উপবেশন করাই একাদশী উপবাসের প্রকৃত অর্থ। এজন্য প্রয়োজন শুদ্ধ খাবার ও যোগাভ্যাস। একাদশী উপবাসের নিয়ম

একাদশী তিথি কিঃ

একাদশী একটি চান্দ্র তিথি। চাঁদের শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথি। সনাতন ধর্মমতানুসারে পুণ্যতিথি হিসেবে বিবেচিত। সনাতনধর্মমতে নিরম্বু উপবাস বিহিত। একাদশী ব্রত অবশ্য পালনীয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তার লীলাবিলাসের প্রথম থেকেই “একাদশী উপবাসের” প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন। শ্রীল জীব–গোস্বামী তার ভক্তিসন্দর্ভ গ্রন্থে স্কন্ধ পুরাণের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, “যে মানুষ একাদশীর দিন শস্যদানা গ্রহণ করে সে তার পিতা, মাতা, ভাই এবং গুরু হত্যাকারী, সে যদি বৈকুণ্ঠ লোকেও উন্নীত হয়, তবুও তার অধঃপতন হয়।” এসময় সাধারণত ফলমূল ও বিভিন্ন সবজি এবং দুধ খাওয়া যায়, তবে একাদশীতে পঞ্চ রবিশস্য বর্জন করা বাঞ্ছনীয়।

বিশেষ একাদশী তিথিঃ বিষ্ণুর শয়ন, পার্শ্ব পরিবর্তন ও উত্থান উপলক্ষে যথাক্রমে আষাঢ়, ভাদ্র ও কার্তিক মাসের শুক্লা একাদশী বিশেষ শুভপ্রদ গণ্য করা হয়। ভৈমী একাদশী ও মাঘের শুক্লা একাদশীকেও বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। নিয়মিত একাদশী পালন শরীরের পক্ষেও উপকারী। তাই স্বাস্থ্যগত কারণেও অনেকে প্রতি মাসে দুটি একাদশী তিথি পালন করেন।

বৈষ্ণব মতে একাদশী পালনের নিয়মাবলিঃ

একাদশীর মূল কাজ হল– নিরন্তর ভগবানকে স্মরণ করা। তাই আপনারা যে নিয়মে, যে সময়ে পালন করুন না কেন, ভগবানকে ভক্তিভরে স্মরণ করাই যেন আপনারই মূল কাজ হয়। একাদশী পালনের সাত্ত্বিক নিয়মগুলো হলো:

১। সমর্থ পক্ষে দশমীতে একাহার, একাদশীতে নিরাহার, ও দ্বাদশীতে একাহার করতে হবে ।

২। তা হতে অসমর্থ পক্ষে শুধুমাত্র একাদশীতে অনাহার।

৩। যদি উহাতেও অসমর্থ হন, একাদশীতে পঞ্চ রবিশস্য বর্জন করে ফলমূলাদি অনুকল্প গ্রহণের বিধান রয়েছে।

সমর্থ পক্ষে রাত জাগরণের বিধি আছে, গৌড়ীয় ধারায বা আচার্যবৃন্দের অনুমোদিত পঞ্জিকায় যে সমস্ত একাদশী নির্জলা (জল ব্যতীত) পালনের নির্দেশ প্রদান করেছেন, সেগুলি সেমতে পালন করলে সর্বোত্তম হয়। নিরন্তর কৃষ্ণভাবনায় থেকে নিরাহার থাকতে অপারগ হলে নির্জলাসহ অন্যান্য একাদশীতে কিছু — সবজি, ফলমূলাদি গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন — গোল আলু, মিষ্টি আলু, চাল কুমড়ো, পেঁপে, টমেটো, ফুলকপি ইত্যাদি সবজি ঘি অথবা বাদাম তেল দিয়ে রান্না করে ভগবানকে উৎসর্গ করে আহার করতে পারেন। হলুদ, মরিচ, ও লবণ ব্যবহার্য। আবার অন্যান্য আহার্য, যেমন — দুধ, কলা, আপেল, আঙুর, আনারস, আখ, আমড়া শস্য, তরমুজ, বেল, নারিকেল, মিষ্টি আলু , বাদাম ও লেবুর শরবত ইত্যাদি ফলমূলাদিও খাওয়া যেতে পারে।

একাদশীতে পাঁচ প্রকার রবিশস্য গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছেঃ—

১। ধানজাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন – চাউল, মুড়ি, চিড়া, সুজি, পায়েস, খিচুড়ি, চালের পিঠা, খৈ ইত্যাদি।

২। গমজাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন – আটা, ময়দা, সুজি, বেকারির রুটি বা সকল প্রকার বিস্কুট, হরলিক্স ইত্যাদি।

৩। যব বা ভুট্টাজাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন — ছাতু, খই, রুটি ইত্যাদি।

৪। ডালজাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন — মুগ, মাসকলাই, খেসারি, মসুরি, ছোলা, অড়হর, ফেলন, মটরশুঁটি, বরবটি ও সিম ইত্যাদি।

৫। সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, তিলের তেল ইত্যাদি। উপর্যুক্ত পঞ্চ রবিশস্যের যেকোন একটি একাদশীতে গ্রহণ করলে ব্রত নষ্ট হয়।

উল্লেখ্য: যারা সাত্ত্বিক আহারী নন এবং চা, বিড়ি/সিগারেট, পান, কফি ইত্যাদি নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করেন, একাদশী ব্রত পালনের সময়কাল পর্যন্ত এগুলি গ্রহণ না করাই ভালো।

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, একাদশী করলে যে কেবল নিজের জীবনের সদ্গতি হবে তা নয়। একাদশী পালন করা ব্যক্তির প্রয়াত পিতা/মাতা যদি নিজ কর্ম দোষে নরকবাসী হন, তবে সেই পুত্রই (একাদশী ব্রত) পিতা–মাতাকে নরক থেকে উদ্ধার করতে পারে। একাদশীতে অন্ন ভোজন করলে যেমন নরকবাসী হবে, অন্যকে ভোজন করালেও নরকবাসী হবে।

যোগ-বিজ্ঞানের আলোকে একাদশী উপবাস কি আর কিভাবে করবেন?

উপ–বস–ঘঞ প্রত্যয়ে উপবাস এর প্রকৃত অর্থ ‘সামীপ্য বাস’ অর্থাৎ ভগবৎ সমীপে বাস করার নামই উপবাস। পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় ও পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় এই দশ ইন্দ্রিয় ও মন স্থির করে ভগবৎ সমীপে উপবেশন করাই একাদশী উপবাসের প্রকৃত অর্থ।

কেবল অনাহার বা অভুক্ত অবস্থায় ধর্মকর্মাদি করলেই এই ইন্দ্রিয় স্থির করা সম্ভব নয়। শুদ্ধ খাবার ও যোগাভ্যাসের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়াদির স্থিরত্ব লাভ করতে পারলেই ইন্দ্রিয় সংযম স্থায়ী হয়। তখন আর বাইরের অনিত্য সুখ–ভোগের কামনা বাসনা ও মায়া মোহে চিত্তকে অভিভূত করতে পারে না। সেই অবস্থায় সাধকের ক্ষুধা তৃষ্ণা আপনা আপনি হ্রাস পেতে থাকে। সাধক সর্ব্বদা আত্মানন্দে বিভোর থাকাতে স্থিত প্রজ্ঞারূপ পারণ বা পূর্ণভাবে “তৎপরায়ন” অবস্থায় বাইরের কর্ম্মানুষ্ঠান করলেও সাধক কর্ম্মে আবদ্ধ বা ভবিষ্যত প্রারদ্ধেরও সৃষ্টি হতে হয় না।

একাদশ রুদ্র হলেন মানব শরীরের দশ চালিকা শক্তি এবং এক আত্মা। বৃহদারন্যক উপনিষদে একাদশ রুদ্র হলেনঃ প্রাণ, অপান, উদান, ব্যান, সমান, নাগ, কুর্ম্ম, কৃকল, দেবদত্ত, ধনঞ্জয় ও আত্মা।

মানব দেহের দশ চালিকা শক্তি কি ও নিয়ন্ত্রণের উপায়ঃ প্রাণ বায়ু হৃদয়ে অবস্থান করে না‌সিকার মাধ্য‌মে নিঃশ্বাস–প্রশ্বাস প্রবা‌হিত হয়। এই বায়ু অন্যান্য বায়ুর ক্রিয়াকে পরিচালিত করে তাই এই বায়ুকে প্রধান বায়ু বলা হয়। আর অপান বায়ু গুহ্যে অবস্থান করে মলাশয় দি‌য়ে মল নিষ্ক্রমণ ক‌রে। এই দুই বায়ু নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল একমাত্র প্রাণায়াম।

উদান বায়ুর অবস্থান কণ্ঠে। কন্ঠনালী দি‌য়ে প্রবা‌হিত হয় এবং যার অব‌রো‌ধের ফ‌লে শ্বাসরোধ হয়, তা‌কে উদান বায়ু বলে। আর ব্যান বায়ু সর্ব শরীরে অবস্থান করে। এদের নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল মহামুদ্রা।

সমান বায়ুর অবস্থান নাভিমূলে। উদ‌রে খাদ্যদ্রব্য সং‌যোজন করে এবং কখনও কখনও শব্দ ক‌রে ঢেকুর তোলায় তা‌কে সমান বায়ু বলে। এই বায়ু স্থির করার উপায় নাভি ক্রিয়া।

নাগ বায়ুঃ যা চক্ষু, মুখ ইত্যা‌দি‌কে বিস্তার কর‌তে সাহায্য ক‌রে, তা‌কে ব‌লে নাগ বায়ু। মুদ্রা ও প্রাণায়ামের দ্বারা এই বায়ু স্থির করা যায়।

কৃকর বায়ু– যে বায়ু ক্ষুধা বৃ‌দ্ধি ক‌রে, তা‌কে ব‌লে কৃকর বায়ু। খেচরী মুদ্রা ও প্রাণায়ামের দ্বারা এই বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কূর্ম বায়ু– যে বায়ু সং‌কোচ‌নে সাহায্য ক‌রে, তা‌কে ব‌লে কূর্ম বায়ু। এই বায়ুকেও নিয়ন্ত্রণ করার উপায় প্রাণায়াম।

দেবদত্ত বায়ু– যে বায়ু হাই তোলার মাধ্য‌মে ক্লা‌ন্তি দূরীকর‌ণে সাহায্য ক‌রে, তা‌কে ব‌লে দেবদত্ত বায়ু। কিছু আসন ও প্রাণায়ামের দ্বারা এই বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ধনঞ্জয় বায়ু– যে বায়ু পু‌ষ্টি সাধ‌নে সাহায্য ক‌রে, তা‌কে ব‌লে ধনঞ্জয় বায়ু। যোগ সাধন ও প্রাণায়ামের দ্বারা একে স্থির করা যায়।

মানব দেহের দশ চালিকা শক্তি ও মন অর্থাৎ একাদশ রুদ্রের কথা ভাগবতের ৩/৬/৯ উল্লেখিত রয়েছে।

অর্থাৎ দেহস্থ ইন্দ্রিয় ও একাদশ রুদ্রের নিয়ন্ত্রণ করাই একাদশী উপবাসের উদ্দেশ্য। একমাত্র শুদ্ধ খাবার ও যোগাভ্যাসের মাধ্যমেই দেহস্থ ইন্দ্রিয় ও বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

যোগী পিকেবি প্রকাশ, পরিচালক, আনন্দম্‌ ইনস্টিটিউট অব যোগ  মেইলঃ yogabangla@gmail.com

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
সংবাদ প্রতিনিধি

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।