ভারতের প্রখ্যাত যোগগুরু ও পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত স্বামী ড. শিবানন্দের আবির্ভাব দিবস আজ। ১৮৯৬ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন ভারতের অন্তর্গত বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার হরিতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দীর্ঘায়ু, সাদাসিধে জীবনযাপন, যোগচর্চা ও মানবসেবার কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি পেয়েছিলেন এই যোগসাধক।
স্বামী শিবানন্দের পিতা ছিলেন শ্রীনাথ গোস্বামী এবং মা ভগবতী দেবী। শৈশবেই তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। মাত্র চার বছর বয়সে তাকে নবদ্বীপের সন্ন্যাসী স্বামী ওঙ্কারানন্দের কাছে দেওয়া হয়। ছয় বছর বয়সে বাড়িতে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার বড় বোন অনাহারে মারা গেছেন। এর মাত্র কয়েকদিন পরই তার বাবা-মায়েরও মৃত্যু হয়।
পরবর্তীতে তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপে চলে যান এবং সেখানে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। জীবনের পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বিভিন্ন সূত্রে তার চিকিৎসাবিদ্যা ও পরবর্তী উচ্চশিক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যোগ ও আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।
স্বামী শিবানন্দের জীবনদর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সরলতা ও সংযম। তিনি মনে করতেন, পরিমিত আহার, নিয়মিত যোগচর্চা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তিনি অল্প খাবার গ্রহণ করতেন এবং তেলযুক্ত খাবার, দুধ ও বিভিন্ন ধরনের বিলাসী খাদ্য এড়িয়ে চলতেন বলে তার অনুসারীরা জানান।
যোগচর্চার পাশাপাশি মানবসেবাকেও তিনি জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ভক্তদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ না করার বিষয়টিও তার জীবনযাপনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে পরিচিত ছিল।
বিদেশেও তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল। বিভিন্ন দেশের অনুরাগীদের আমন্ত্রণে তিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন এবং যোগব্যায়াম, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সাদাসিধে জীবনযাপনের বার্তা ছড়িয়ে দেন।
দীর্ঘ জীবনের কারণে স্বামী শিবানন্দ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়ে ওঠেন। ২০২২ সালে ১২৫ বছর বয়সে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছ থেকে তিনি পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণ করেন। পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রাষ্ট্রপতির সামনে তার বিনয়ী আচরণ উপস্থিত ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
দীর্ঘায়ুর জন্য পরিচিত এই যোগগুরু ২০২৫ সালের ৩ মে ভারতের উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে ১২৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
বারাণসীতে বসবাসের সময়ও তার মানবসেবার নানা দৃষ্টান্তের কথা জানা যায়। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া তীর্থযাত্রীদের জন্য এক ভক্তের দেওয়া একটি ফ্ল্যাট ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে আগত পূণ্যার্থীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা বিনামূল্যে করার উদ্যোগও ছিল বলে তার অনুসারীরা জানান।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যোগচর্চা, সংযম ও মানবসেবার আদর্শে অটল ছিলেন স্বামী ড. শিবানন্দ। তার জীবন দীর্ঘায়ুর পাশাপাশি সরলতা, আত্মসংযম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে অনুসারীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।