রংপুর: দেশের চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি জানান, কোনো এলাকা দুর্গম কি না তা শুধু প্রশাসনিক বিবেচনায় নয়, বরং বিদ্যালয়ের অবস্থান, যাতায়াতের দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বাস্তব দুর্গমতার মাত্রা বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হবে। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে বিশেষ ভাতার কাঠামো তৈরি করা হবে।
দেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোকে এ সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টিও সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
আজ রংপুরের পিটিআই অডিটোরিয়ামে প্রাথমিক শিক্ষা রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয় আয়োজিত দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ
প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনকে আরও কার্যকর করতে দায়িত্ব বণ্টন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জবাবদিহিতার বিষয়গুলো স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেন ববি হাজ্জাজ।
আরও পড়ুনঃ খাদ্যগুদামের সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ: খাদ্যমন্ত্রী
তিনি বলেন, শুধু প্রশাসনিক পদসোপান তৈরি করলেই একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না। প্রত্যেক কর্মকর্তাকে নিজের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত ও যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রশাসনের কোনো একটি স্তরের কার্যক্রম যেন অন্য স্তরের কাজের প্রতিবন্ধক না হয়। বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিদ্যালয় পর্যন্ত সমন্বিত কর্মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সব কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষ—এ কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনিক সংস্কারের সুফল শেষ পর্যন্ত শিশুদের শেখার পরিবেশ ও শিক্ষার মানে দৃশ্যমান হতে হবে।
আগামী বছর চালু হচ্ছে ‘সায়েন্স টয়’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতা বাড়াতে আগামী বছর পাইলট প্রকল্পের আওতায় ‘সায়েন্স টয়’ কার্যক্রম চালুর কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
আরও পড়ুনঃ সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে কমিটি
তার মতে, খেলাধুলা ও হাতে-কলমে বিভিন্ন বিষয় শেখার মাধ্যমে শিশুদের বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ছাড়া নতুন প্রাথমিক কারিকুলামে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আটটি ক্রীড়া কার্যক্রম বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
শুধু পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষা নয়, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে শিশুদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়িয়ে আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান পরিচালনার প্রচলন বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের অনিয়ম কিংবা দায়িত্বে অবহেলা মেনে নেওয়া হবে না। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রত্যেক শিক্ষককে নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
দুর্গম এলাকা চিহ্নিত করতে মাঠপর্যায়ের মতামত
দুর্গম এলাকার জন্য বিশেষ ভাতা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোন অঞ্চলকে প্রকৃত অর্থে দুর্গম হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সেটি নতুনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দুর্গম এলাকা চিহ্নিত করার বিষয়ে কর্মশালায় আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামত ও সুপারিশ লিখিতভাবে সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত এসব সুপারিশের ভিত্তিতে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিশ্বমানের প্রাথমিক শিক্ষা গড়ার লক্ষ্য
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, মানসম্মত ও আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব ও কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিটি শিক্ষার্থী যাতে নৈতিক শিক্ষা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য উপযোগী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী, পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ কামরুল হাসান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ইসরাত জাহান।
এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা রংপুর বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালক, বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট, ইউপিটিসি ইন্সট্রাক্টরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কর্মশালায় অংশ নেন।



