দীর্ঘ ৩৫ বছর পর গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট
গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট

১৯৯১ সালের পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ ৩৫ বছর রাষ্ট্রপতি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এবার গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে যা বেশি ইতিবাচক।

আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণের কথা রয়েছে। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীরাই সাধারণত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসছেন।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ২২টি নির্বাচন হয়েছে। তবে ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোট হওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি।

১৯৯১ সালের পর আর ভোট হয়নি

১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার পরিবর্তে সংসদীয় বা মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। একই বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন প্রণয়ন করা হয়। এরপর এই আইনের অধীনেই সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

১৯৯১ সালের প্রথম নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। আরেক সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন প্রার্থী হলেও পরে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন।

আরও পড়ুনঃ সংগ্রাম, রাজনীতি ও জীবনের শেষ প্রান্তে মির্জা ফখরুলের জীবনের নতুন অধ্যায়

তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ ওই নির্বাচনে পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় সংসদের অধিবেশন না থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে সংসদের বিশেষ বৈঠক ডেকে ভোট নেওয়া হয়েছিল।

১৯৯১ সালের নির্বাচনটি হয়েছিল ওপেন ব্যালটে। ফলে ভোটগ্রহণের সময় কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে দৃশ্যমান ছিল।

এবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা

নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে আগামী ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করেছে। বিএনপি থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সাবেক মন্ত্রী কর্নেল অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

জাতীয় সংসদে বর্তমানে ৩৪৯ জন সদস্য রয়েছেন। আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম-৪ আসনে নির্বাচিত প্রার্থী অযোগ্য হওয়ায় ওই আসনে বর্তমানে কোনো ভোটার নেই।

সংসদে দলীয় অবস্থানের হিসাবে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলোর সদস্যসংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের সমর্থিত প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন ইসি কর্মকর্তারা।

বর্তমান সংসদে সাধারণ আসনে বিএনপির ২১১ জন, জামায়াতের ৬৮ জন, এনসিপির ৬ জন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে আরও ১৪ জন সদস্য রয়েছেন। সংরক্ষিত আসনেও বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সদস্যসংখ্যা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের তুলনায় বেশি।

ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনকে স্বাগত জানাচ্ছেন সাবেক কর্মকর্তা

১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত থাকা সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার চেয়ে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হওয়াই গণতান্ত্রিকভাবে বেশি ইতিবাচক।

তার মতে, একটি নির্বাচন আইন থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় রাষ্ট্রপতি পদে বারবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। বিরোধী দলগুলো প্রার্থী দিলে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব হতো।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল

ইসি সচিব আখতার আহমেদের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১৬ আগস্ট। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট

একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।

এবার সংসদের নিয়মিত অধিবেশন না থাকায় ভোটের জন্য বিশেষ বৈঠক আয়োজন করা হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকলে ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে সংসদের বৈঠক আহ্বান করতে হয়।

কীভাবে হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজন সংসদ সদস্যকে সমর্থক হিসেবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে। প্রার্থীকে নিজের সম্মতিসূচক ঘোষণাও দিতে হবে।

মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের পর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পরও একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনা প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হবে। কোনো প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পেলেই তিনি নির্বাচিত হবেন। একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে বৈধ প্রার্থী একজনই থাকলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পর ওই প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।

২২টি নির্বাচনে নির্বাচিত ১১ জন

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। ইসি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, দেশে এ পর্যন্ত ১২টি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পেয়েছেন ১১ জন, মোট ১২ বার।

১৯৭৪ সালে সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৭৮ সালের ৩ জুন জিয়াউর রহমান, ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর আবদুস সাত্তার এবং ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

১৯৯০ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসে। ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদ সদস্যদের ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ২২ আগস্ট শাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ২০০২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জিল্লুর রহমান এবং ২০১৩ ও ২০১৮ সালে আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

সর্বশেষ ২০২৩ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন নির্বাচিত হন।

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি স্পিকার

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। স্পিকার তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর থেকে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

এর আগে ২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মো. সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। সংবিধান অনুযায়ী তার মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়ার কথা ছিল।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ কত বছর

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের দিন থেকে পাঁচ বছর পদে বহাল থাকেন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন।

একজন ব্যক্তি পরপর হোক বা বিরতি দিয়ে হোক, দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার ভোটগ্রহণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রক্রিয়ায় ফিরছে কি না, সেটিই এখন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত বিষয়।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।