নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রখ্যাত বাঙালি শিক্ষক, পণ্ডিত ও দেশপ্রেমিক বেণী মাধব দাসের প্রয়াণ দিবস আজ। ১৯৫২ সালের ২ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের পাশাপাশি তাঁর দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ তৎকালীন প্রজন্মের বহু শিক্ষার্থীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
বেণী মাধব দাসের জন্ম তৎকালীন বাংলার চট্টগ্রাম জেলার শেওড়াতলী গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কৃষ্ণচন্দ্র দাস। দর্শনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভের পর তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং চট্টগ্রাম কলেজে যোগ দেন। তাঁর নেতৃত্ব ও শিক্ষাদর্শে প্রতিষ্ঠানটি একটি আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা, কটকের র্যাভেনশ স্কুল, কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলসহ কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার সময় তাঁর প্রজ্ঞা, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সুভাষচন্দ্র বসুর শিক্ষাগুরু
বেণী মাধব দাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয়গুলোর একটি হলো তিনি ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অন্যতম প্রভাবশালী শিক্ষক। তরুণ সুভাষের চিন্তাভাবনা, দেশপ্রেম ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে তাঁর প্রভাব ছিল গভীর।
শুধু সুভাষচন্দ্র বসু নয়, শরৎচন্দ্র বসুসহ তৎকালীন সময়ের আরও অনেক শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর শিক্ষাদর্শে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, নৈতিকতা, মানবিকতা, আত্মশৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো।
আরও পড়ুনঃ ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের আবির্ভাব দিবস আজ, বৈষ্ণব ধর্মের পুনর্জাগরণে ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
সুভাষচন্দ্র বসু পরবর্তী জীবনে তাঁর লেখায় বেণী মাধব দাসের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। তাঁর শিক্ষক বেণী মাধবের প্রভাব সুভাষের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
মনীষী কেশবচন্দ্র সেনের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে বেণী মাধব দাস ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্রাহ্ম সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও প্রকাশনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।
দর্শনশাস্ত্রের পাশাপাশি অর্থনীতি ও ইতিহাসেও তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। ধর্ম, দর্শন, সমাজ ও মানবকল্যাণ নিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখেছেন।
অল ইন্ডিয়া থেইস্টিক কনফারেন্সের সভাপতি
১৯২৩ সালে ভারতের কাকিনাডায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া থেইস্টিক কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন বেণী মাধব দাস। সম্মেলনে তাঁর দেওয়া বক্তব্য পরবর্তীতে Modern Theistic Movement in India নামে প্রকাশিত হয়।
আরও পড়ুনঃ আজ ২ সেপ্টেম্বর বুধবার পঞ্জিকা ও ইতিহাসের এইদিনে
তাঁর প্রবন্ধ সংকলন Pilgrimage Through Prayers পাঠক ও সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা লাভ করে। তাঁর লেখালেখিতেও ধর্মীয় উদারতা, মানবিকতা ও নৈতিক চেতনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
দুই বিপ্লবী কন্যার পিতা
বেণী মাধব দাসের পারিবারিক জীবনও ছিল ব্রাহ্ম সমাজ ও সমাজসেবার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তিনি কলকাতার সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদকের কন্যা সরলা দেবীকে বিয়ে করেন। সরলা দেবী নিজেও সমাজসেবায় সক্রিয় ছিলেন এবং অসহায় ও দুস্থ নারীদের সহায়তায় কাজ করেন।
এই দম্পতির দুই কন্যা কল্যাণী দাস ও বীণা দাস পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। কল্যাণী দাস বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও সমাজসেবায় সক্রিয় ছিলেন। আর বীণা দাস ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সাহসী ভূমিকার জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন প্রিয় শিক্ষক
বেণী মাধব দাসের শিক্ষকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর শান্ত ও স্নেহশীল আচরণ। কটক ও কৃষ্ণনগরে তাঁর সংস্পর্শে আসা শিক্ষাবিদ নিরঞ্জন নিয়োগীর স্মৃতিচারণেও তাঁর এই গুণের উল্লেখ পাওয়া যায়।
আরও পড়ুনঃ আজ বিশ্ব নারিকেল দিবস: কৃষি-অর্থনীতি ও পুষ্টিতে নারিকেলের গুরুত্ব
নিরঞ্জন নিয়োগীর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সময়ও বেণী মাধব দাস কঠোরতা বা আড়ম্বরের আশ্রয় নিতেন না। তাঁর শান্ত, আকর্ষণীয় ও আন্তরিক আচরণ শিক্ষার্থীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলত। অস্থির বা দুরন্ত শিক্ষার্থীরাও তাঁর সংস্পর্শে এসে শান্ত ও শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠত।
শিক্ষকতা, সমাজচিন্তা, দেশপ্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বেণী মাধব দাসের জীবন তাই ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর প্রয়াণের বহু বছর পরও একজন আদর্শ শিক্ষক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে তাঁর স্মৃতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।




