নিজস্ব প্রতিবেদক: ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের পুনর্জাগরণ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর। শিক্ষিত সমাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বৈষ্ণব ভাবধারা ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন ছড়িয়ে দিতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।
১৮৩৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর নদিয়ার উলা (বর্তমান বীরনগর) এলাকায় মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন কেদারনাথ দত্ত, যিনি পরবর্তী সময়ে ‘ভক্তিবিনোদ ঠাকুর’ নামে পরিচিত হন। তাঁর পিতা ছিলেন আনন্দচন্দ্র দত্ত এবং মাতা জগন্মোহিনী দেবী।
শৈশব থেকেই সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। মাত্র দুই বছর বয়সেই তাঁর মধ্যে কবিত্বের প্রতিভার প্রকাশ ঘটে বলে বৈষ্ণব জীবনীগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে কবিতা, গান ও ধর্মীয় সাহিত্যে তাঁর এই প্রতিভার বিকাশ ঘটে।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ব নারিকেল দিবস
শৈশবেই সংস্কৃত ও ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি জ্যোতিষশাস্ত্র ও দর্শনের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ছয় বছর বয়সে স্থানীয় টোলে সংস্কৃত শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণনগর ও উলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন।
কৈশোরেই পিতাকে হারান কেদারনাথ। তৎকালীন সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন এবং শিক্ষা ও সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে তিনি কটক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং পরে ভদ্রক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। চাকরিজীবনের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেন।
আরও পড়ুনঃ আজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) আপনার রাশিফল ও গ্রহদোষ প্রতিকারের উপায়
গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ইতিহাস, দর্শন ও সাধন-পদ্ধতি নিয়ে তাঁর গবেষণা এবং রচনাগুলো পরবর্তী সময়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ৪০০ গৌরাব্দে গৌড়ীয় গোস্বামী সংঘের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘ভক্তিবিনোদ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপর থেকেই তিনি শ্রীসচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর নামে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
পুরীতে কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কাটান ভক্তিবিনোদ ঠাকুর। জগন্নাথদেবের ধাম পুরীতে অবস্থানকালে তিনি ধর্মীয় সাধনা, কীর্তন ও বৈষ্ণব দর্শন প্রচারে সক্রিয় ছিলেন।
তাঁর পরিবারেও বৈষ্ণব ভাবধারার গভীর প্রভাব ছিল। ১৮৭৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পুরীতে তাঁর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বিমলাপ্রসাদ দত্ত। পরবর্তীকালে তিনি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর নামে গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আরও পড়ুনঃ বেণী মাধব দাসের প্রয়াণ দিবস আজ: নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর শিক্ষাগুরুর জীবন ও কর্ম
ভক্তিবিনোদ ঠাকুর শুধু ধর্মীয় সাধক ছিলেন না; তিনি ছিলেন লেখক, কবি, দার্শনিক ও সংগঠক। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও পুনর্জাগরণে তাঁর লেখনী এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর রচনার মাধ্যমে বৈষ্ণব দর্শনকে আধুনিক শিক্ষিত সমাজের কাছে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়।
আরও পড়ুনঃ আজ ২ সেপ্টেম্বর বুধবার পঞ্জিকা ও ইতিহাসের এইদিনে
১৯০৮ সালে তিনি বৈষ্ণব সাধনার আরও গভীর পর্যায়ে প্রবেশ করেন। জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত তিনি রাধাকৃষ্ণের ভক্তি ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের সাধনায় নিবিষ্ট ছিলেন।
১৯১৪ সালের ২৩ জুন কলকাতার ভক্তিভবনে ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের তিরোভাব ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর সাহিত্য, দর্শন ও ধর্মীয় চিন্তাধারা গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়।
বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের পুনর্জাগরণের ইতিহাসে তাই ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অনুসারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণার উৎস।


