রাজনৈতিক বড় ভাইদের ছত্রছায়া : চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকাণ্ডে অর্ধশত কিশোর গ্যাং

রাজিব শর্মা,(চট্টগ্রাম ব্যুরো): চট্টগ্রাম মহানগরীতে বেপরোয়া অর্ধশত কিশোর গ্যাং জড়িয়ে পড়েছে দখলবাজি ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। সেবন করছে ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্য। আধিপত্য বিস্তারে এদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে অবৈধ অস্ত্রও। বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের সন্তান যেমন আছে, তেমনি আছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানও। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো- রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ছত্রছায়ায় এসব তরুণ-কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসনের অভাবে তরুণ-কিশোররা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। চট্টগ্রামে সম্প্রতি স্কুলছাত্র আদনান ইসফার হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫ কিশোরের জিজ্ঞাসাবাদে নগরীতে স্কুলকেন্দ্রিক প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং-এর তথ্য দেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, সিএমপির কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি হাজি মুহাম্মদ মহসিন উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজিয়েট স্কুল, কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ, বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাজেরা-তজু উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি হাইস্কুলসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্কুলে ‘স্কুল ছাত্রলীগের’ নামে এসব কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠেছে। যারা নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশি, ফয়েস লেক, ডেবারপার, চান্দগাঁও শমসেরপাড়া, ফরিদেরপাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় এসব গ্যাংয়ের আদিপত্য বেশি। মাদক বেচাকেনাসহ মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই, গান-বাজনা, খেলার মাঠ, ড্যান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণে তারা মরিয়া। শুধু তাই নয়, এসব কিশোর গ্যাংচক্র মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের বেশির ভাগ ঘটনায় জড়িত। নিজ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক সময় তারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায়। এ রকম নগরীর ১৬ থানা এলাকায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাংচক্রের তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন অনেকে ছাত্রলীগের নাম দিয়ে নগরীর পাড়ায়-মহল্লায় কিশোর ও বখাটে গ্যাং বানিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করছে। শুধু নিজেদের মধ্যে হানাহানি নয়, নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় কিশোর অপরাধীদের উৎপাত বেড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় তুচ্ছ ঘটনায় সদলবলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয় কিশোর সন্ত্রাসীরা। এদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে খুনের ঘটনাও। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে কিংবা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুচর হিসেবে কাজ করছে অনেক কিশোর। বিভিন্ন মহল্লায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি থেকে শুরু করে ছিনতাই-রাহাজানির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে এরা। নগর গোয়েন্দা পুলিশের

অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামানের মতে, রাজনৈতিক সমর্থন, বিপুল অর্থপ্রাপ্তি, এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপের উত্থান। এর মধ্যে কাজেম আলী স্কুল মার্কেটের মামার দোকানে জিলহস গ্রুপ, জামালখান আংকেলের দোকান ও দেবপাহাড়ে রনি, সাফায়েত ও ফাহিম গ্রুপ, জামালখানে সাব্বিরের আরো একটি গ্রুপ, মেজ্জান হাইলে আইয়্যু রেস্তোরাঁর কাছে খালার দোকান ভিত্তিক আলাদা কিশোর গ্যাংগ্রুপ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের বিচরণ আন্দরকিল্লা মোড় থেকে রহমতগঞ্জ হয়ে গণি বেকারি সীমানাও ছাড়িয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) সালেহ মোহাম্মদ তানভীর The Crime কে বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে অপরাধীদের নামের তালিকা ইতোমধ্যে তৈরির কাজ শুরু করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। নগরীর ১৬টি থানার ওসিদের এ তালিকা তৈরি করে এক সপ্তাহের মধ্যে পুলিশ কমিশনার বরাবরে পাঠানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তালিকায় কোন থানায় কতজন কিশোর অপরাধী রয়েছে, তারা কখন কোথায় অবস্থান করে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়েছে। পরে এ ব্যাপারে পুলিশ অ্যাকশনে যাবে।

সিএমপির উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসাইন The Crime কে বলেন, গত এক দশকে চট্টগ্রাম শহরের জামালখানসহ বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অসংখ্য কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান ও এদের বেপরোয়া কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুশাসন বাড়াতে হবে। যেসব বড় ভাই তাদের ইন্ধন দেয়, তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এ পুলিশ কর্মকর্তার মতে, মোবাইল ও ইন্টারনেট খুবই সহজলভ্য। তবে এর ভালো প্রয়োগের চেয়ে অপব্যবহার বেশি হচ্ছে এসব উঠতি বয়সীদের মধ্যে। এ কারণে কিশোরদের অপরাধ হচ্ছে অনেক বেশি। ফেসবুকে প্রতারণা করে ফাঁদে ফেলে টাকা আদায়সহ বহু অপরাধ হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তাই কিশোরদের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি অভিভাবকদের নজর রাখা উচিত।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
সংবাদ প্রতিনিধি

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।