চীন-রাশিয়ার সমর্থনেও BRICS-এ জায়গা পাচ্ছে না পাকিস্তান, কেন?

চীন-রাশিয়ার সমর্থনেও BRICS-এ জায়গা পাচ্ছে না পাকিস্তান, কেন?
পাকিস্তান কেন BRICS

বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জোট BRICS-এ যোগ দেওয়ার চেষ্টা পাকিস্তান বেশ কয়েক বছর ধরেই চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদের জন্য আবেদনও করে। চীনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের আগ্রহে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার খবরও সামনে এসেছিল। তবু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও BRICS-এর সদস্য হতে পারেনি পাকিস্তান।

এমন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজধানীতে একই মঞ্চে উপস্থিত রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা।

তবে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চের বাইরে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। দুই দেশই এখনও BRICS-এর পূর্ণ সদস্য নয়। বিশেষ করে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সদস্যপদ-চেষ্টা প্রশ্ন তুলেছে—চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশের সমর্থন পাওয়ার পরও কেন ইসলামাবাদের জন্য BRICS-এর দরজা খুলছে না?

২০২৩ সালেই সদস্যপদের আবেদন করে পাকিস্তান

পাকিস্তান ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে BRICS-এ যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে এবং সদস্যপদের জন্য আবেদন করে। ইসলামাবাদের এই আগ্রহের পেছনে কেবল কূটনৈতিক মর্যাদা নয়, রয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক হিসাবও।

দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণের চাপ এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে পাকিস্তান। এমন পরিস্থিতিতে BRICS-এর মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারলে নতুন বাজার, বিনিয়োগ এবং বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে দেশটি।

আরও পড়ুনঃ দেশে ইলিশের ঘাটতি, ভারত থেকে আসছে শত শত টন মাছ

চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এই দুই দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টাও করেছে ইসলামাবাদ। কিন্তু BRICS-এর সদস্যপদ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুধু কয়েকটি দেশের সমর্থন যথেষ্ট নয়।

ঐকমত্যের নিয়মই বড় বাধা

BRICS-এ নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশের আপত্তি থাকলে নতুন আবেদনকারীর সদস্যপদ প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যেতে পারে।

এখানেই পাকিস্তানের সামনে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের অবস্থান। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সীমান্ত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে নয়াদিল্লি ইসলামাবাদের BRICS সদস্যপদের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ভারতের দৃষ্টিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত উদ্বেগও পাকিস্তানের সদস্যপদের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। ফলে চীন বা রাশিয়ার সমর্থন থাকলেও ভারতের আপত্তির কারণে পাকিস্তানের আবেদন এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

কেন BRICS-এ যোগ দিতে এত আগ্রহ পাকিস্তানের?

বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে BRICS-এর গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। জোটটি সম্প্রসারিত হওয়ার পর এর সদস্যসংখ্যা ও বৈশ্বিক প্রভাব দুটোই বেড়েছে।

২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ সম্মেলনের পর BRICS সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জোটে যুক্ত হয়। সৌদি আরবকেও অন্তর্ভুক্তির জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, অন্যদিকে আমন্ত্রণ পাওয়ার পর আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত সদস্য হয়নি। পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়াও জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়।

আরও পড়ুনঃ রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, ব্যয় ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা

বর্তমানে BRICS বিশ্বের বিপুল জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত বাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বিকল্প আর্থিক সহযোগিতার সম্ভাবনা পাকিস্তানের মতো অর্থনৈতিক চাপে থাকা দেশের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়।

ভারতের সঙ্গে BRICS বাণিজ্যও বাড়ছে

BRICS সদস্যদের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে BRICS দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের মোট পণ্য বাণিজ্য প্রায় ৪১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে BRICS দেশগুলোর বাজারে ভারতের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

এই বিশাল অর্থনৈতিক পরিসর পাকিস্তানের BRICS-এ যোগদানের আগ্রহকে আরও বাড়িয়েছে। সদস্য হতে পারলে বৃহত্তর বাজারে প্রবেশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন সুযোগ পেতে পারে ইসলামাবাদ।

দিল্লির সম্মেলন, বাইরে পাকিস্তান

১৮তম BRICS সম্মেলন যখন নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, তখন পাকিস্তানের অনুপস্থিতিও বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।

ইসলামাবাদ উদীয়মান অর্থনীতির এই জোটে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বাণিজ্যিক পরিসর বাড়াতে চায়। কিন্তু সদস্যদের ঐকমত্যের নীতি এবং ভারতের আপত্তি পাকিস্তানের সামনে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

ফলে আপাতত চীন ও রাশিয়ার সমর্থন থাকলেও পাকিস্তানের BRICS সদস্যপদ নিশ্চিত হওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। বরং ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত টানাপোড়েনের কারণে বিষয়টি ভবিষ্যতেও জটিল থাকতে পারে।

দিল্লিতে যখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলো BRICS-এর মঞ্চে ভবিষ্যতের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিক নিয়ে আলোচনা করছে, তখন পাকিস্তানকে এখনও সেই মঞ্চের বাইরে থেকেই সদস্যপদের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।