অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে পশ্চিমবঙ্গে কঠোর অবস্থান শুভেন্দু অধিকারীর, বাংলাদেশে বাড়ছে উদ্বেগ

অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে পশ্চিমবঙ্গে কঠোর অবস্থান শুভেন্দু অধিকারীর, বাংলাদেশে বাড়ছে উদ্বেগ
অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী

ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত ও ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের শনাক্ত করে আটক রাখা হবে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত অনিবন্ধিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

৩০ অক্টোবর ২০২৬ উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে এক জনসভায় শুভেন্দু অধিকারী বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভারতে থাকতে দেওয়া হবে না। তাঁদের জন্য হোল্ডিং সেন্টারের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-এর আওতাভুক্ত যোগ্য হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া দ্রুত করার আশ্বাস দেন তিনি।

এর আগে গত ২০ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়। এই ব্যবস্থায় রাজ্য পুলিশের হাতে আটক সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভারতে অবৈধ বাংলাদেশি কতজন, প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর নেই

ভারতে অবৈধভাবে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। ২০১৪ সালে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু সংসদে এক থেকে দেড় কোটি অবৈধ বাংলাদেশি ভারতে অবস্থান করছেন বলে একটি আনুমানিক হিসাব উল্লেখ করেছিলেন। তবে এই সংখ্যাকে বর্তমান সময়ের যাচাইকৃত পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ভারত সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যেও স্বীকার করা হয়েছে, গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশকারীদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। ২০১৮ সালে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অবৈধ অভিবাসীদের নির্ভুল সংখ্যা নির্ধারণের মতো কেন্দ্রীয় তথ্য তাদের কাছে নেই।

পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে পশ্চিমবঙ্গে ৫০ থেকে ৬০ লাখ এবং আসামে কয়েক লাখ অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছেন—এমন দাবির পক্ষে হালনাগাদ ও নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি।

ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও অবস্থান করলে আইনি ব্যবস্থা

ভারতে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে প্রবেশের পর নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রম করে অবস্থান করাও অভিবাসন আইনের লঙ্ঘন। একইভাবে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ভারতে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫’। এই আইনে বিদেশিদের প্রবেশ, অবস্থান, নিবন্ধন ও বহিষ্কারসংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি নির্ধারিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত রাজ্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও পালন করতে পারে।

অবৈধভাবে ভারতে অবস্থানকারীদের শনাক্ত করতে পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ভিসা এবং অন্যান্য নথি যাচাই করা হচ্ছে। তবে কোনো ব্যক্তিকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; তাঁর পরিচয় ও জাতীয়তা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

দিল্লিতে বাংলাদেশি নাগরিক শনাক্ত ও ফেরত পাঠানোর ঘটনা

২০২৫ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিককে শনাক্ত করার খবর প্রকাশিত হয়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২৯ মে ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশের অভিযানে প্রায় এক মাসে ৪৭০ জনকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। একই সময়ে অতিরিক্ত ৫০ জন বিদেশির ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করে অবস্থানের বিষয়টিও সামনে আসে। প্রতিবেদনে দিল্লি থেকে ছয় মাসে অন্তত ৭৭০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর তথ্য উল্লেখ করা হয়।

তবে এসব অভিযান ও ফেরত পাঠানোর পরিসংখ্যানকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত অবৈধ বাংলাদেশির মোট সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

আসামে দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অবস্থান

অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও দীর্ঘদিন ধরে কঠোর বক্তব্য দিয়ে আসছেন। সীমান্ত নিরাপত্তা, জাতীয় নাগরিকত্ব এবং বিদেশি নাগরিক শনাক্তকরণ নিয়ে আসামে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের বিষয়ে রাজ্য প্রশাসনগুলোকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে এ বিষয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে বিশেষ টাস্কফোর্স এবং হোল্ডিং সেন্টার গঠনের নির্দেশনা দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়তে পারে?

ভারতে অবৈধভাবে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের শনাক্তকরণ ও ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ জোরদার হলে বাংলাদেশের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও অন্যান্য রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে যাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব রয়েছে, তাঁদের শুধু ভাষা, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা সন্দেহের ভিত্তিতে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। একইভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও জাতীয়তা যাচাই এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা সংকট একটি বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর মধ্যে ভারত থেকে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসন বা অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক চাকরি করছেন—সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এই দাবিরও নির্ভরযোগ্য সরকারি যাচাই প্রয়োজন। দুই দেশের অভিবাসন ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তথ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে স্বচ্ছ সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রকাশ করা জরুরি।

দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে নদী, জনবসতি, কৃষিজমি ও দুর্গম এলাকা থাকায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।

অবৈধ সীমান্ত পারাপার বন্ধ করা, মানবপাচার ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করা দুই দেশেরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া কাউকে জোরপূর্বক সীমান্তের ওপারে পাঠানোর অভিযোগ যেন না ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শুভেন্দু অধিকারী সরকারের কঠোর অবস্থানের ফলে পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই নীতি বাস্তবায়নে কতজনকে শনাক্ত করা হয় এবং বাংলাদেশ-ভারত সরকারের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়।

অভিবাসন সমস্যা মোকাবিলায় রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে নির্ভুল তথ্য, স্বচ্ছতা, মানবাধিকার এবং দুই দেশের কার্যকর কূটনৈতিক সমন্বয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।