স্বশিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষি প্রযুক্তিতে দীর্ঘদিন অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ব্যক্তি ক্যাটাগরিতে ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্মাননা ২০২৬’ পেয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের মো. সোলেমান আলী। আর প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে শিক্ষা সেবায় বিশেষ অবদান রাখার কারণে একই সম্মাননা পেয়েছে বেসরকারি সংস্থা ‘সুরভি’।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি শিক্ষা ছাড়াই স্বশিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ১৯৯৬ সাল থেকে সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষি প্রযুক্তিতে কাজ করে আসছেন সোলেমান আলী। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেচ, মৎস্যচাষ ও গবাদিপশু ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রযুক্তির বিভিন্ন উদ্ভাবন করেছেন তিনি।
সোলেমান আলীর পরিচালিত ২৮টি সৌর সেচপাম্পের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে প্রায় ৩০০ একর জমিতে স্বল্প খরচে পরিবেশবান্ধব সেচের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া তিনি এমন একটি সৌর প্যানেল পরিচালনা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা কোনো মোটর ছাড়াই সূর্যের গতিপথ অনুসরণ করে সর্বোচ্চ সূর্যালোক গ্রহণ করতে পারে।
নিজের অর্জিত জ্ঞান নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি সোলেমান আলী। স্থানীয় যুবকদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন। প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে তিনি একজন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাদাতা ও রোল মডেল হিসেবেও ভূমিকা রাখছেন।
সম্মাননা গ্রহণের পর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন সোলেমান আলী। তিনি বলেন, অর্থের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লেখাপড়া করতে পারেননি। কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠার পর বিভিন্ন কাজ ও ব্যবসার পাশাপাশি নিজে নিজে প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করি। আইপিএস ও ব্যাটারির ব্যবসা করতে গিয়ে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়।
পরে কৃষিকাজে ডিজেলচালিত সেচপাম্পের উচ্চ ব্যয় কমানোর চিন্তা থেকেই সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচব্যবস্থা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়াতে থাকেন। নিজের উদ্যোগের পাশাপাশি ঋণ নিয়ে সৌর সেচের যন্ত্র তৈরি করে কৃষকদের ভাড়ায় দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন।
সোলেমান আলী বলেন, আমার উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে কৃষি ও পরিবেশ দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমার বাড়িতে আরও বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবন রয়েছে বলেও জানান তিনি। কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে কৃষি, মাছ চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে সম্মাননা পাওয়া সুরভি ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চার দশকের বেশি সময় ধরে ঢাকার বস্তিবাসী, শ্রমজীবী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাসেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর প্রতিষ্ঠিত সুরভি মূলত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে।
সুরভির উদ্যোগে ২০২৩ সাল থেকে ইউনিসেফের সহায়তায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৭টি সেন্টারে ‘অ্যাবিলিটি বেইজড অ্যাকসেলারেটেড লার্নিং’ বা এবিএএল প্রকল্পের আওতায় ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী ২ হাজার ১০ জন শিশুকে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ২০১৭ সাল থেকে এতিম শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। ২০২১ সাল থেকে ‘নারীর ক্ষমতা’ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের আইটি সহ বিভিন্ন বৃত্তিমূলক ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সুরভির শিক্ষা কার্যক্রমে প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনদক্ষতা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবেশ, শিশুর অধিকার ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মূলধারার বিদ্যালয়ে পুনরায় অন্তর্ভুক্তি এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতিতে সহায়তা করছে।
এ ছাড়া ইউনিসেফ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটি নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে শক্তিশালী সামাজিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে সুরভি। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
সম্মাননা গ্রহণের পর সুরভির নির্বাহী পরিচালক মো. আবু তাহের বলেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করে আসছেন।
মাত্র একজন শিশুকে নিয়ে সুরভির যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘদিনের কার্যক্রমে প্রায় ২৮ লাখ শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনার সুযোগ হয়েছে। শুধু শিক্ষা নয়, শিশুদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একটি শিক্ষিত জাতি ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখনো যারা শিক্ষার বাইরে রয়েছে, তাদের শিক্ষার আওতায় এনে নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব জেসমিন নাহার। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনেস্কো বাংলাদেশের অফিস প্রধান ডক্টর সুজন ভাইসের প্রতিনিধি শিরিন আক্তার।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. মোখলেছুর রহমান এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মনোয়ারা ইশরাতসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



