এর মাত্র এক দিন আগে ইরানের সঙ্গে কোনো যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ না নেওয়ার অবস্থান জানিয়েছিল বাহরাইন। ফলে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা ওমানের
বার্তাসংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা দেয় ওমান।
ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গঠনমূলক আলোচনা এবং কার্যকর সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে বৈঠকটি পরবর্তী কোনো সময়ে আয়োজন করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করার পাশাপাশি এই অঞ্চলের জনগণের সহযোগিতা ও শান্তির আকাঙ্ক্ষা পূরণে কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানোর মতো পরিবেশ তৈরি করাই বৈঠক স্থগিতের মূল উদ্দেশ্য।
আরও পড়ুনঃ ইমাম-উল-হকের বিরুদ্ধে বাড়ছে অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ঐকমত্যের স্বার্থে সালালাহতে অনুষ্ঠেয় আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার জন্য সহায়ক সংলাপ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ওমানের প্রতিশ্রুতির কথা জানান।
তবে বৈঠকের নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ঠিক কোন কারণে শেষ মুহূর্তে বৈঠকটি স্থগিত করা হলো, সে বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি ওমান।
বৈঠকে থাকার কথা ছিল আট দেশের
বদর আলবুসাইদির প্রকাশিত পোস্টে বাহরাইন, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের পতাকা দেখা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের এসব দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, নৌ চলাচল এবং প্রস্তাবিত নতুন নৌপথ নিয়ে আলোচনাই বৈঠকের প্রধান বিষয় হওয়ার কথা ছিল।
ইরানের সঙ্গে বৈঠকে আপত্তি বাহরাইনের
ওমানের বৈঠক স্থগিতের এক দিন আগে ইরানকে নিয়ে প্রস্তাবিত আঞ্চলিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেয় বাহরাইন।
শনিবার বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের আগে ইরানের সঙ্গে কোনো যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবে না মানামা।
হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তাবের বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাহরাইন এ অবস্থান জানায়।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এর আগে জানিয়েছিলেন, ওমানের উদ্যোগে আয়োজিত বৈঠকে তেহরান অংশ নেবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলবর্তী আটটি দেশের প্রতিনিধিদেরও বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
নতুন নৌপথ নিয়ে কী বলেছে ইরান?
হরমুজ প্রণালির প্রস্তাবিত নতুন নৌপথ নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এটিই বৈঠকের মূল এবং কার্যত একমাত্র আলোচ্য বিষয়।
লন্ডনভিত্তিক আরবি সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদকে দেওয়া বক্তব্যে আরাগচি দাবি করেন, নতুন নৌপথ নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। এতে নৌপথের মানচিত্র এবং এর ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতিও রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ওমানের সঙ্গে এই চুক্তির অর্থ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের সময় ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইনও ছিল।
তেহরানের দাবি অনুযায়ী, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ইসা বিমানঘাঁটির নামও উল্লেখ করেছে ইরান।
হরমুজ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক হামলা শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়।
পরবর্তী সময়ে জুনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরিত হয়। তবে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে মতবিরোধের কারণে সেই সমঝোতার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এরপর আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আবারও সামরিক হামলা শুরু করলে ইরান ওয়াশিংটনের মিত্র আরব দেশগুলোর কয়েকটি স্থানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায়।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ওমানের স্থগিত করা বৈঠকটি কবে অনুষ্ঠিত হবে এবং নতুন নৌপথ নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।





