আজ জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস-২০২৬। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য— ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’।
নির্ভুলভাবে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শুধু নাগরিকের আইনগত পরিচয় ও অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যম নয়; এটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, সুষম বাজেট বরাদ্দ এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ নাগরিককে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তবে বিদ্যমান কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এই লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনো নিবন্ধনের বাইরে
বর্তমানে দেশে জন্ম নিবন্ধনের গড় হার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার প্রায় ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক নাগরিক এখনো জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের আওতার বাইরে রয়েছেন। এর ফলে অনেক মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো জন্ম নিবন্ধন না থাকলে শিশুর বয়স ও পরিচয় নির্ধারণে সমস্যা তৈরি হয়। এর সুযোগে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, মানবপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নাগরিকদের সঠিক তথ্যের ঘাটতি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও সেবা ব্যবস্থাপনাকেও দুর্বল করে।
অন্যদিকে মৃত্যু নিবন্ধন না থাকলে মৃত ব্যক্তির আইনগত পরিচয় ও উত্তরাধিকার নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দুর্গম এলাকায় মৃত্যু নিবন্ধনের হার কম
গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি চর, পাহাড়ি এলাকা এবং শহরের বস্তি এলাকায় মৃত্যু নিবন্ধনের হার তুলনামূলকভাবে কম। এসব এলাকায় নিবন্ধন ব্যবস্থা সহজলভ্য করা এবং সাধারণ মানুষকে নিবন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস আজ: ‘অনন্য এবং ঐক্যবদ্ধ’
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্য যত বেশি নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ হবে, সরকারের পক্ষে জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য খাতে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ তত সহজ হবে।
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে সার্বজনীন ও নির্ভুল জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করতে ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’ সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবারের ওপর নিবন্ধনের পুরো দায়িত্ব না রেখে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হলে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
তাঁদের হিসাবে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুর জন্ম হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জন্মের তথ্য সরাসরি নিবন্ধন ব্যবস্থায় যুক্ত করা গেলে বিপুলসংখ্যক শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ভুল জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আসতে পারে।
এতে তথ্যের ভুল ও বিকৃতি কমানোর পাশাপাশি ভুয়া নিবন্ধনের সুযোগও সীমিত হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। এর ফলে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এসডিজি ১৬.৯, অর্থাৎ সবার জন্য আইনগত পরিচয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জনও দ্রুততর হতে পারে।
‘সুশাসনের প্রথম শর্ত নির্ভুল তথ্য’
জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)-এর নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, নাগরিকদের নির্ভুল ও সর্বজনীন তথ্য সংরক্ষণ সুশাসন নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান শর্ত।
আরও পড়ুনঃ আজ আন্তর্জাতিক ভূবৈচিত্র্য দিবস: টেকসই পৃথিবী গড়তে ভূসম্পদের গুরুত্ব
তিনি বলেন, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’ সংস্কার করে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব দেওয়া হলে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য অর্জন আরও সহজ হবে।
জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবসের মূল বার্তাও হচ্ছে—নির্ভুল ও সর্বজনীন নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের আইনগত পরিচয়, অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে একটি তথ্যভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।





