শারদীয়া দুর্গাপূজার ষষ্ঠাদি কল্পে দেবী কাত্যায়নী মাতার পূজা । জেনে নিন মন্ত্র, বিধি ও মাহাত্ম্য

শারদীয়া দুর্গাপূজার ষষ্ঠাদি কল্পে দেবী কাত্যায়নী মাতার পূজা । জেনে নিন মন্ত্র, বিধি ও মাহাত্ম্য
কাত্যায়নী মাতার পূজা

শারদীয়া দুর্গাপূজার ষষ্ঠী তিথিতে দেবী দুর্গার ষষ্ঠ স্বরূপ মা কাত্যায়নীর আরাধনা করা হয়—বিশেষত উত্তর ভারতীয় শারদীয়া নবরাত্রির নবদুর্গা পূজাপদ্ধতিতে। দেবী কাত্যায়নী শক্তি, সাহস, ধর্মরক্ষা ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। কাত্যায়নী মাতার পূজা

ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় দৃষ্টিতে দেবী কাত্যায়নী

দেবী কাত্যায়নীর ইতিহাস আলোচনা করতে হলে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে তাঁর উল্লেখ, পৌরাণিক কাহিনি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন—এই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। দেবীর আবির্ভাব ও মহিষাসুর বধের বিবরণ ধর্মীয় আখ্যানের অংশ; আর তাঁর উপাসনার ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয় প্রাচীন গ্রন্থ, মূর্তি ও উপাসনাপদ্ধতির সূত্র ধরে।

১. প্রাচীন গ্রন্থে দেবী কাত্যায়নীর উল্লেখ

কাত্যায়নী নামটি যজুর্বেদের সঙ্গে সম্পর্কিত তৈত্তিরীয় আরণ্যক-সহ প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্যের আলোচনায় পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে স্কন্দপুরাণ, বামনপুরাণ এবং দেবীভাগবত পুরাণে দেবীর পরিচয়, মাহাত্ম্য ও আবির্ভাবের বিভিন্ন কাহিনি বিস্তৃত হয়েছে।

২. মহিষাসুরমর্দিনী রূপের বিকাশ

মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্য বা দুর্গাসপ্তশতী শাক্তধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। গবেষণামূলক সূত্রে গ্রন্থটির রচনাকাল সাধারণত খ্রিস্টীয় পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শতকের কাছাকাছি বলে বিবেচিত হয়। এতে দেবীকে মহাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যিনি অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে ধর্ম ও বিশ্বব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করেন।

কাত্যায়নী ও মহিষাসুরবধের কাহিনি বিভিন্ন পুরাণে কিছুটা ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। কোথাও দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে দেবীর আবির্ভাবের কথা বলা হয়েছে; আবার প্রচলিত কাহিনিতে মহর্ষি কাত্যায়নের তপস্যা ও দেবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের উল্লেখ রয়েছে। তাই সব পুরাণের বিবরণকে একটিমাত্র অভিন্ন কাহিনি হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

৩. প্রাচীন ভারতে দেবীর উপাসনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

ভারতীয় উপমহাদেশে দুর্গা ও মহিষাসুরমর্দিনী রূপের উপাসনার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় কুষাণ যুগের মথুরা অঞ্চলে মহিষাসুরমর্দিনী-সম্পর্কিত বহু মূর্তি ও ক্ষুদ্র প্রতিমা আবিষ্কারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলো প্রাচীন ভারতে দেবীর শক্তিরূপের উপাসনা বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তবে প্রতিটি মূর্তিকে নির্দিষ্টভাবে কাত্যায়নী দেবীর প্রতিমা বলে শনাক্ত করার আগে তার শিলালিপি, নির্মাণকাল ও প্রতিমাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যাচাই করা প্রয়োজন।

৪. নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপ হিসেবে কাত্যায়নী

পরবর্তী হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবী কাত্যায়নী নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত হন। নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে তাঁর পূজা প্রচলিত। সিংহবাহিনী ও অস্ত্রধারিণী দেবীর রূপ সাহস, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

৫. শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলায় কাত্যায়নী পূজা

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের দশম স্কন্ধের ২২তম অধ্যায়ে ব্রজের গোপীকাদের কাত্যায়নী দেবীর পূজা করার বিবরণ রয়েছে। তাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে স্বামী হিসেবে লাভ করার কামনায় ব্রত পালন করেছিলেন বলে আখ্যানটিতে উল্লেখ আছে। এই কাহিনি উত্তর ভারতের ভক্তিধারায় কাত্যায়নী পূজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে।

দেবী কাত্যায়নীর ঐতিহাসিক পরিচয় কেবল মহিষাসুরবধের পৌরাণিক কাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে তাঁর নামের উল্লেখ, পুরাণে তাঁর মাহাত্ম্যের বিস্তার, দুর্গার শক্তিরূপের উপাসনা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন—সব মিলিয়ে ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে।

ঐতিহাসিক সতর্কতা: দেবীর আবির্ভাবের নির্দিষ্ট সাল বা মহিষাসুরবধের ঘটনাকে যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণ এখানে পাওয়া যায় না। তাই ধর্মীয় বিশ্বাস, পুরাণের বর্ণনা ও ইতিহাসভিত্তিক প্রমাণকে পৃথকভাবে বিবেচনা করাই যথাযথ।

দেবী কাত্যায়নীর ধ্যানমন্ত্র

সংস্কৃত মন্ত্র:

चन्द्रहासोज्ज्वलकरा शार्दूलवरवाहना।

कात्यायनी शुभं दद्याद् देवी दानवघातिनी॥

বাংলা উচ্চারণ:

চন্দ্রহাসোজ্জ্বলকরা শার্দূলবরবাহনা। কাত্যায়নী শুভং দদ্যাদ্ দেবী দানবঘাতিনী॥

ভাবার্থ: যাঁর হাতে উজ্জ্বল খড়্গ, যিনি সিংহবাহিনী এবং দানববিনাশিনী, সেই দেবী কাত্যায়নী আমাদের মঙ্গল বিধান করুন।

 দেবী কাত্যায়নীর পূজামন্ত্র

ওঁ দেবী কাত্যায়ন্যৈ নমঃ।

এই মন্ত্র উচ্চারণ করে ভক্তিভরে দেবীর চরণে প্রণাম ও পূজা নিবেদন করা যায়। প্রচলিত উপাসনাপদ্ধতিতে মন্ত্রটি ১১, ২১ অথবা ১০৮ বার জপ করার রীতি রয়েছে।

৪. কাত্যায়নী মাতার পূজার সাধারণ বিধি

1. সকালে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করুন এবং পূজাস্থান পরিষ্কার রাখুন।

2. দেবী দুর্গা ও মা কাত্যায়নীর প্রতিমা বা ছবির সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করুন।

3. ফুল, ধূপ, দীপ, ফল ও সামর্থ্য অনুযায়ী নৈবেদ্য নিবেদন করুন।

4. দেবী কাত্যায়নীর ধ্যানমন্ত্র ও পূজামন্ত্র পাঠ করুন।

5. ইচ্ছা অনুযায়ী দেবীমাহাত্ম্য, শ্রীশ্রী চণ্ডী বা দুর্গাস্তোত্র পাঠ করুন।

6. শেষে আরতি করে পরিবার ও সকলের মঙ্গল, শান্তি, সাহস এবং কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করুন।

প্রচলিত নিবেদন: দেবী কাত্যায়নীর পূজায় মধু, লাল ফুল এবং বিশেষত লাল গোলাপ নিবেদনের রীতি রয়েছে। তবে উপাচার ও পূজার ক্রম অঞ্চল, পারিবারিক পরম্পরা এবং অনুসৃত পূজাপদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

৫. পূজার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে মা কাত্যায়নীর আরাধনা ভয় দূর করা, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, বাধা অতিক্রম এবং জীবনে শুভশক্তির বিকাশের প্রার্থনার সঙ্গে যুক্ত। বিবাহ ও পারিবারিক জীবনের মঙ্গল কামনাতেও অনেক ভক্ত তাঁর পূজা করেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।