বিশ্ব খাদ্য দিবস আজ: জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার ঝুঁকি

বিশ্ব খাদ্য দিবস আজ: জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার ঝুঁকি
'পানি জীবন, পানিই খাদ্য। কেউ থাকবে না পিছিয়ে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্ব খাদ্য দিবস

আজ ১৬ অক্টোবর, বিশ্ব খাদ্য দিবস। ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা, সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এবং খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত এই দিবস বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে কৃষি মন্ত্রণালয় ও এফএওর যৌথ উদ্যোগে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। খাদ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক মূল্যায়নে প্রায় ২৬ কোটি মানুষের তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভোগার চিত্র উঠে এসেছে।

বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ও মানুষের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে এসব এলাকার দরিদ্র পরিবার ও শিশুরা অপুষ্টির বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সাতক্ষীরায় খাদ্যসংকটে বিপর্যস্ত জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক—খানি বাংলাদেশের পরিচালিত এক গবেষণায় সাতক্ষীরা শহরের ৩৫টি অনানুষ্ঠানিক বস্তির ৩৫৮টি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।

জরিপে আরও দেখা গেছে, ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যকে খাবারের পরিমাণ কমাতে হয়েছে অথবা দিনের কোনো বেলার খাবার বাদ দিতে হয়েছে। ৫২ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে পুরো এক দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। খাদ্যের সংস্থান করতে ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার উৎপাদনশীল সম্পদ কিংবা প্রয়োজনীয় গৃহস্থালিসামগ্রী বিক্রি করেছে।

নিরাপদ পানির সংকটও এসব পরিবারের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত অগভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল। গত এক মাসে জরিপভুক্ত প্রায় অর্ধেক পরিবারের সদস্যদের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

বাসস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সরকারি জমিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ৫৯ শতাংশ উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের হুমকির মুখে রয়েছে। গত ১২ মাসে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পায়নি। সহায়তা না পেলে কিংবা প্রয়োজনের সময় কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, তা জানে না ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার।

শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষার চিত্রও চিন্তার কারণ। গবেষণা অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত নয়। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা এসব শিশুর মধ্যে ৩০ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত।

অপুষ্টির ঝুঁকিতে উপকূলীয় শিশুরা

উপকূলীয় অঞ্চলে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণায় দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি ও খর্বকায়তার উচ্চ হার উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভাব শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বসতভিটা হারিয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো একদিকে যেমন আয়ের অনিশ্চয়তায় ভুগছে, অন্যদিকে তেমনি খাদ্য, বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণেও হিমশিম খাচ্ছে।

বৈশ্বিক সংকটে খাদ্যের দাম ও ক্রয়ক্ষমতা বড় বাধা

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের চতুর্থ দিনে ‘বিপর্যয়ের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং এসব সংকটের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।

জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইএসসিডব্লিউএ) নির্বাহী সচিব রোলা দাশতি বলেন, সংস্থাটির ২২টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৯টি দেশ সরাসরি সংঘাত অথবা সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে। তাঁর মতে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু খাদ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেই চলবে না; মানুষের সেই খাদ্য কেনার আর্থিক সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

রোলা দাশতির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের হিসাবে পুষ্টিকর খাবারের মূল্য প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, খাদ্যের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার শিকার হতে পারেন।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল লক্ষ্য ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা, নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। তবে খাদ্যনিরাপত্তা কেবল কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের আয়, খাদ্যের ন্যায্য মূল্য, বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও গভীরভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, লবণাক্ততা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির সরবরাহ, শিশু ও মায়েদের পুষ্টিসেবা এবং জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সহায়তা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং সরকারি-বেসরকারি সহায়তা সহজলভ্য করা প্রয়োজন।

বিশ্ব খাদ্য দিবসের তাৎপর্য হলো—কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে এবং প্রত্যেক মানুষ যেন নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ গড়ে তোলা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।