ইসরায়েলের নির্বাচনে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তায় নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের নির্বাচনে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তায় নেতানিয়াহু
ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। একইভাবে বিরোধী জোটও সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পায়নি। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে আবারও রাজনৈতিক সমীকরণ ও দর-কষাকষির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

১২০ সদস্যের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা ৪৮। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব দলগুলোর অবস্থান। এসব দলের সম্মিলিত আসন ১৯টি হওয়ায় সরকার গঠনের চূড়ান্ত সমীকরণে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এলেও সরকার গঠনের বিষয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না নেতানিয়াহু। পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত রাজনৈতিক আলোচনা ও জোট গঠনের দর-কষাকষি চলতে পারে।

বিশ্লেষকদের সামনে এখন সরকার গঠনের পাঁচটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।

সরকার গঠনে যে পাঁচটি সমীকরণ সামনে আসছে

১. নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের সরকার

বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার, নাফতালি বেনেটের টুগেদার এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল আওয়ার হোম পার্টির সমর্থন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও বেশি, অর্থাৎ ৬৬টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত হতে পারে।

তবে এই সমীকরণ বাস্তবায়ন করতে হলে নেতানিয়াহুকে তাঁর বর্তমান অতি-ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল জোটসঙ্গীদের কয়েকজনকে ছাড়তে হতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে নিজেদের পূর্বঘোষিত অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। ফলে এ ধরনের সমঝোতা সহজ হবে না।

২. প্রধানমন্ত্রীর পদ ভাগাভাগি করে সরকার গঠন

আরেকটি সম্ভাবনা হলো নেতানিয়াহু ও গাদি আইজেনকোটের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির সমঝোতা। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদে একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং পরবর্তী মেয়াদে অন্যজন দায়িত্ব নেবেন।

তবে এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ, নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সম্ভাবনা আগেই প্রত্যাখ্যান করেছেন আইজেনকোট।

৩. বিরোধী শিবির থেকে সদস্য নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন

নেতানিয়াহুর জোটের সরকার গঠনের জন্য আরও আটটি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। এ অবস্থায় বিরোধী শিবিরের কোনো কোনো দল বা নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করতে পারে তাঁর জোট।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলীয় অবস্থান পরিবর্তন, জোট ভাঙা এবং নতুন সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতার সমীকরণ বদলের নজির রয়েছে। নেতানিয়াহুও অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল নিয়েছেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী শিবির থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায় করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

৪. আরব দলগুলোর সমর্থনে বিরোধী জোটের সরকার

সরকার গঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে বিরোধী শিবিরের সামনে। গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের ৪৮টি আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন যুক্ত হলে মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৭। অর্থাৎ, আরব দলগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে বিরোধী জোট সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।

২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন সরকারে প্রথমবারের মতো একটি স্বাধীন আরব রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। তবে এবারের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল। বিরোধী জোটের বেনেট ও লিবারম্যানসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের বিরোধিতা করছেন। ফলে সংখ্যার হিসাবে সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ পথ কঠিন।

৫. নতুন করে সাধারণ নির্বাচন

সব ধরনের আলোচনা ও সমঝোতা ব্যর্থ হলে ইসরায়েলকে আবারও সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হতে পারে। অতীতে সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও কোনো পক্ষ প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

যেসব ইস্যুতে সরকার গঠন আরও কঠিন হচ্ছে

ইসরায়েলের রাজনৈতিক সংকট কেবল আসনসংখ্যার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন সরকারকে বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর জাতীয় ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এর মধ্যে রয়েছে অতি-রক্ষণশীল ইহুদি যুবকদের বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যর্থতার বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত এবং গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ।

এসব বিষয়ে নেতানিয়াহুর জোট ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে সরকার গঠনের আলোচনা সফল হলেও নীতিগত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা নতুন নেতৃত্বের জন্য কঠিন হতে পারে।

তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকছেন নেতানিয়াহু

নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যে সতর্ক অবস্থান জানিয়েছেন গাদি আইজেনকোট। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালনের সময় দেশের নিরাপত্তাকে দলীয় বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করার বিষয়ে তিনি নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছেন।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে জমা দেওয়ার পর তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এরপর সরকার গঠনের জন্য কোনো নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠন সম্ভব না হলে দেশটিকে আবারও নির্বাচনের পথে যেতে হতে পারে।

সব মিলিয়ে ইসরায়েলের নির্বাচনী লড়াই শেষ হলেও ক্ষমতার চূড়ান্ত লড়াই এখনো বাকি। নেতানিয়াহু কি রাজনৈতিক কৌশলে আবারও ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি বিরোধী শিবির নতুন সরকার গঠনে সফল হবে—তা নির্ভর করছে আগামী দিনের জোট আলোচনা ও রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

দ্য নিউজ ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।