নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ: বদলে যেতে পারে বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য

নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ: বদলে যেতে পারে বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য
বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার ভারতের দীর্ঘদিনের দাবি এখন আর শুধু নয়াদিল্লির কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়; এটি ক্রমেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতন্ত্র, বিশাল অর্থনীতি, পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভারত মনে করে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভারতের পাশাপাশি জাপান, জার্মানি ও ব্রাজিলসহ জি-৪ দেশগুলোও নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ও স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ১৫টি সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—স্থায়ী সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। জাতিসংঘ সনদের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই কাঠামো নিয়েই মূল বিতর্ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক শক্তির বিন্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি নিরাপত্তা পরিষদে আজকের অর্থনৈতিক, জনসংখ্যাগত ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার যথাযথ প্রতিফলন নেই—এমন অভিযোগ বহু দেশের। ভারতও বলছে, নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, কার্যকর ও গণতান্ত্রিক করতে হলে স্থায়ী ও অস্থায়ী—উভয় ধরনের সদস্যপদ সম্প্রসারণ প্রয়োজন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও জাতিসংঘের সংস্কারবিষয়ক আলোচনায় ভারত এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—ভারত এখনো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হয়নি এবং ভেটো ক্ষমতাও অর্জন করেনি। জাতিসংঘের বর্তমান সরকারি তালিকায় ভারতের সর্বশেষ অস্থায়ী সদস্যপদের মেয়াদ ছিল ২০২১-২০২২।

তাই ভারতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক সমর্থনকে একটি আনুষ্ঠানিক ও কার্যকর সংস্কার প্রক্রিয়ায় রূপ দেওয়া। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ কাঠামো পরিবর্তন করতে হলে জাতিসংঘ সনদ সংশোধনের মতো জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

তারপরও ভারতের দাবি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিশ্বের ক্ষমতার কাঠামো কি এখনো ১৯৪৫ সালের বাস্তবতায় পরিচালিত হবে, নাকি একবিংশ শতাব্দীর নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা পুনর্গঠিত হবে?

ভারত স্থায়ী সদস্যপদ অর্জন করতে পারলে সেটি নিঃসন্দেহে শুধু নয়াদিল্লির কূটনৈতিক বিজয় হবে না; এটি এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব, বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ কাঠামোতেও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

ভারতের দাবি বাস্তবায়িত হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—ভেটো ক্ষমতা ভোগ করে। ফলে কোনো একটি স্থায়ী সদস্যের নেতিবাচক ভোটেও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আটকে যেতে পারে।

ভারতের পাশাপাশি জাপান, জার্মানি ও ব্রাজিলও নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের দাবিতে সক্রিয়। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ অর্জন কিংবা ভেটো ব্যবস্থার অবসান এখনো নিশ্চিত কোনো বাস্তবতা নয়। জাতিসংঘ সনদ সংশোধনের জন্য স্থায়ী পাঁচ সদস্যের সম্মতিও প্রয়োজন হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত জটিল।

অতএব, ভারতের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবি এখন একটি দেশের আসন পাওয়ার প্রশ্নের বাইরে গিয়ে নতুন ও অধিক প্রতিনিধিত্বশীল বিশ্বব্যবস্থার দাবিতে পরিণত হয়েছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।